বিআইডিএসের সম্মেলন শেষ
জ্বালানির সমাধান না হলে প্রকট হতে পারে সংকট
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০২২ | ২৩:৪৪
জ্বালানি সংকটকে এখন দেশের প্রধান সমস্যা মনে করেন সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা। তাঁদের মতে, জ্বালানি নিয়ে সেভাবে ভাবা হয়নি। কার্যকর জ্বালানি নীতি নেওয়া হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়া কিংবা অর্থনৈতিক সংকট এতটা গভীর হতো না। গ্যাস সংকটের সমাধান না হলে আমদানি-রপ্তানি সরবরাহ বিঘ্নিত হয়ে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হতে পারে। সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে গ্যাস সংকটের একটা স্থায়ী সমাধানে পৌঁছার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
রাজধানীর হোটেল লেকশোরে গতকাল শনিবার অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) উন্নয়নবিষয়ক বার্ষিক সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে এসব কথা বলেন তাঁরা। বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেনের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান।
ড. মশিউর রহমান বলেন, বিভিন্ন খাতে দেওয়া সরকারের ভর্তুকি এক ধরনের বিনিয়োগ। এর বিরুদ্ধে আইএমএফ কোনো কথা বলেনি। তারা বিষয়টিকে আরও যুক্তিসঙ্গত করার কথা বলেছে। যাতে যাদের ভর্তুকি প্রয়োজন, তারাই যেন এই সুবিধা পায়। তিনি মনে করেন, ডলারের বিপরীতে টাকার একাধিক বিনিময় হার নির্ধারণ কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, জ্বালানিতে ভর্তুকি নিয়ে অনেক সমালোচনা হচ্ছে। অথচ এই ভর্তুকি দেওয়া হয় স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য। সব দেশেই এমন ভর্তুকি দেওয়া হয়। এ নিয়ে সমালোচনা করলে হবে না। যুক্তরাষ্ট্র কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করার পরামর্শ দিয়ে যায় আবার নিজেরাই এ ধরনের জ্বালানির উৎপাদন বাড়িয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনার পরামর্শ দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেন, গ্যাস সংকটের একটা কার্যকর সমাধানে আসা নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের আলোচনা শুরু হয়েছে। ব্যবসায়ীরা আমদানি করা গ্যাসের বেশি দর দিতে রাজি। সরকারও এতে রাজি। ফলে গ্যাস সংকটের সমাধান হবে শিগগিরই। ব্যাংক ঋণ ও আমানতে ৯/৬ হার তুলে দিলে স্থানীয় শিল্প টিকে থাকতে পারবে না বলে মনে করেন সালমান এফ রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, ব্যাংকে টাকা নেই- এই গুজব ওঠার পর গত কয়েক দিনে গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এতে কোনো বাধা দেয়নি। কিন্তু ব্যাংকে আসলে টাকার সংকট না থাকায় গ্রাহকরা আবার টাকা রাখতে শুরু করেছেন।
গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, করোনার অভিঘাত থেকে বেশ ভালো পুনরুদ্ধার হচ্ছিল, তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ তা থামিয়ে দেয়। দ্রুত এ সমস্যার সমাধানের আশা কম। আগামী বছর আরও খারাপ যাবে বলে সবাই স্বীকার করছেন। অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। নিজস্ব রাজস্ব থাকলে বহিঃখাত নিয়ে এতটা দুশ্চিন্তায় পড়তে হতো না। অন্য দেশ তাই করেছে।
দেবপ্রিয় বলেন, যুদ্ধই যদি বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের একমাত্র কারণ হতো, তাহলে সব দেশেই একই সমস্যা হতো। তিনি বলেন, জ্বালানিনীতি ঠিক হলে অর্থনৈতিক সংকট এতটা গভীর হতো না। মেগা প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন ছিল।
সিপিডির অন্য সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্যাংক ব্যবস্থায় এক পরিবারের পরিচালক দুই থেকে চারজন করা এবং ৭ শতাংশ জরিমানা দিয়ে পাচার অর্থ ফেরত আনার বুদ্ধি কারা সরকারকে দিয়েছে, তা বোঝা দরকার। কারণ, এর মাধ্যমে ব্যাংক ব্যবস্থার শৃঙ্খলা বিনষ্ট করা হয়েছে। অর্থ পাচার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক- কোনো নীতিতেই সমর্থনযোগ্য নয়।
এফবিবিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে এখন শিল্প উৎপাদন মানেই লোকসান। গ্যাস সংকটই এ মুহূর্তে বড় সমস্যা। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে বাড়তি দাম দিতে রাজি তাঁরা। তবে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস থাকতে হবে।
শিল্প খাতের সংকটের কথায় বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, শিল্পকারখানার মূলধনি যন্ত্র এবং কাঁচামাল আমদানি করতে ব্যাংকে ঋণপত্র (এলসি) খুলতে সমস্যা হচ্ছে।
এই অধিবেশনের মাধ্যমে তিন দিনের সম্মেলন শেষ হলো। সম্মেলনের এবারের প্রতিপাদ্য ছিল 'কভিড-উত্তর বিশ্বে অনিশ্চয়তা'। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষক এবং শিক্ষাবিদরা বিভিন্ন অধিবেশনে অংশ নেন।
- বিষয় :
- বিআইডিএস
- জ্বালানি
- জ্বালানি সংকট
