ঢাকা শনিবার, ০৫ জুলাই ২০২৫

রেলের বীমা আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ, আসে না সিদ্ধান্ত

রেলের বীমা আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ, আসে না সিদ্ধান্ত

ফাইল ছবি

 রাজীব আহাম্মদ

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৪ | ০০:৪৬

রেল দুর্ঘটনায় হতাহতদের ক্ষতিপূরণে নেই বীমা। সড়ক ও আকাশপথে ক্ষতিপূরণের বিধান থাকলেও রেল কর্তৃপক্ষ সে ব্যবস্থা করতে পারেনি। রেললাইন অনেক স্থানেই ঝুঁকিপূর্ণ। বেশির ভাগ ইঞ্জিন-বগির আয়ুষ্কাল ফুরিয়েছে। লেভেল ক্রসিংগুলোও অনেক ক্ষেত্রে অরক্ষিত। এসব কারণে একের পর এক ঘটছে দুর্ঘটনা। প্রশ্ন উঠেছে, এসবের দায় যাত্রী কেন নেবে? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টিকিটের সঙ্গে দু’এক টাকা করে বীমার প্রিমিয়াম নেওয়া হলে হতাহতদের যৌক্তিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব। তবে ২০১৯ সাল থেকে বিষয়টি আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ।

দুর্ঘটনায় যাত্রী নিহত হলে আগে মাত্র ১০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিত রেল কর্তৃপক্ষ। রেল মন্ত্রণালয়ের অনুমতির পর চলতি বছরের শুরুতে তা বাড়িয়ে এক লাখ টাকা করা হয়েছে। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ট্রেনে আগুনে নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। 

প্রতিবেশী ভারতে রেলে মাত্র ১ রুপির বীমায় দুর্ঘটনায় নিহত যাত্রীর পরিবার ১০ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ পায়। অঙ্গহানি হলেও একই পরিমাণ বীমা সুবিধা পাওয়া যায়। আংশিকভাবে অক্ষম হলে সাড়ে ৭ লাখ এবং হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হলে ২ লাখ রুপি পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। বীমা সুবিধা পেতে টিকিট কেনার সময় প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হয়।
২০১৯ সালের মার্চে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন দায়িত্বে থাকার সময় রেল বীমা চালু করা নিয়ে কথা হয়। টিকিটের সঙ্গে ১ টাকা করে বীমার প্রিমিয়াম নেওয়ার আলোচনা ছিল। রেলের সাবেক একজন মহাপরিচালক সমকালকে বলেছেন, কথাবার্তা যা হয়েছে, সব মুখে মুখে। বীমা চালুর চিন্তা এগিয়ে নেওয়ার মতো পর্যায়ে যায়নি কখনও। তবে বর্তমান মহাপরিচালক সরদার সাহাদাত আলী সমকালকে বলেছেন, অনেক দূর এগিয়েছে বীমা চালুর চিন্তা। টিকিটের দামের সঙ্গে বীমার প্রিমিয়াম হিসেবে ১ টাকা, নাকি ২ টাকা নেওয়া হবে; না অন্য কোনো প্রক্রিয়া থাকবে– নির্ধারিত হয়নি। আশা করছি, আগামী অর্থবছরে বৈধ যাত্রীর জন্য বীমা চালু সম্ভব হবে।

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদীউজ্জামান সমকালকে বলেছেন, রেলের ৬০ শতাংশ লাইন ঝুঁকিপূর্ণ। ৭০ শতাংশ ইঞ্জিন-বগি আয়ুষ্কাল ফুরানো। ৪০ শতাংশ লেভেল ক্রসিং অরক্ষিত। এর দায় যাত্রী কেন নেবে? শুধু ভারত নয়, বহু দেশে বীমার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রয়েছে। রেল চলছে ১৮৯০ সালের আইনে। আগে আইন যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে বীমা বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা জরুরি। সড়ক পরিবহনে যদি হতাহতের ক্ষতিপূরণে আর্থিক সহায়তা তহবিল করা যায়, রেলে কেন করা যাবে না? সদিচ্ছা থাকলেই হবে। তিনি বলেন, বিভিন্ন সংস্থার তৈরি করা অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের দায় রেলের না হলেও অরক্ষিত ক্রসিংয়ে কেউ হতাহত হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত।  
বেসরকারি সংগঠন যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৫২০ রেল দুর্ঘটনায় ৫১২ জন নিহত হয়েছেন। আরেক বেসরকারি সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যানে গত বছর রেলপথে ২৮৭ দুর্ঘটনায় ৩১৮ জনের প্রাণ গেছে। তবে রেলওয়ের কাছে দুর্ঘটনার বিশদ তথ্য নেই। সংস্থাটি শুধু ট্রেন লাইনচ্যুতি ও সংঘর্ষের হিসাব রাখে। রেললাইনে কাটা পড়া এবং ক্রসিংয়ে হতাহতের হিসাব রাখে না। 

ট্রেনে পাথর ছোড়া বন্ধে রেলের নানা উদ্যোগ থাকলেও নেই হতাহতের তথ্য। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, গত ১০ দিনে ট্রেনে ছোড়া পাথরে যাত্রী আহতের ঘটনা রয়েছে তিনটি। গত ২৭ এপ্রিল জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে চলন্ত যমুনা এক্সপ্রেস ট্রেনে পাথর নিক্ষেপে আকাশ নামে এক যাত্রী আহত হয়েছেন। ২০১৩ সালে চলন্ত ট্রেনে ছোড়া ঢিলে প্রকৌশলী প্রীতি দাশ নিহত হন। ক্ষতিপূরণ পায়নি তাঁর পরিবার। 
রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মো. সাইফুল ইসলাম সমকালকে জানান, নতুন চালু হওয়া কক্সবাজার রেলপথে পাথর ছুড়ে যাত্রীদের আহত করা নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। 

পাথরের আঘাতে, ট্রেনে কাটা পড়ে কিংবা অন্যান্য যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনায় ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নজির নেই। গতকালই কুষ্টিয়ার মিরপুরে অরক্ষিত রেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় পুলিশের উপপরিদর্শক সাহিদুর রহমান নিহত হয়েছেন। রেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩ হাজার ১১১ লেভেল ক্রসিংয়ের ১ হাজার ২২৫টি অরক্ষিত; গেটম্যান নেই। রেলের ভুলেও হতাহতের নজির রয়েছে। গতকাল গাজীপুরের জয়দেবপুরে সংকেতের ভুলে জ্বালানি তেলবাহী এবং যাত্রীবাহী টাঙ্গাইল কমিউটারের (যাত্রীহীন) মুখোমুখি সংঘর্ষে সাতজন আহত হয়েছেন। 

রেলে বছরে ৯ কোটির বেশি যাত্রী চলাচল করেন। সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, টিকিটের সঙ্গে দুই-চার টাকা করে বীমার প্রিমিয়াম নেওয়া হলে হতাহতদের যৌক্তিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব। নানা কারণে বিভিন্ন সময়ে ট্রেনের যাত্রা বাতিল হয়। যাত্রী টিকিটের দাম ফেরত পেলেও ক্ষতিপূরণ পান না। বীমা থাকলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব। আবার যাত্রা বাতিল হলে রেলের যে ক্ষতি, তা পোষানো সম্ভব। কিন্তু কীভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে, কে বৈধ যাত্রী আর কে অবৈধ– নির্ধারণ করা জটিল। 
তবে সড়ক পরিবহনে এ কাজটি গত বছরের জানুয়ারি থেকে করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলনে ২০১৮ সালে পাস হওয়া আইনের ৫৩ (১) অনুযায়ী দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তি বা উত্তরাধিকারী ক্ষতিপূরণ পান আর্থিক সহায়তা তহবিল থেকে। সড়ক পরিবহন বিধিমালার ১৪৯ ধারা অনুযায়ী নিহত ব্যক্তির পরিবার অন্যূন ৫ লাখ টাকা পান। অঙ্গহানিতে ৩ লাখ এবং চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা থাকলে ১ লাখ টাকা সহায়তা পান আহত ব্যক্তি। 

২০২৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ১৯৪ ব্যক্তি এবং উত্তরাধিকারীকে আর্থিক সহায়তা তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা দিয়েছে সরকার। একই বছর তহবিলে চাঁদা এসেছে ১৩৭ কোটি ৫০ লাখ ৬৪ হাজার ৬৩৮ টাকা। অর্থাৎ সরকারকে নিজস্ব তহবিল থেকে টাকা দিতে হয়নি। 

বিধিমালা অনুযায়ী, আর্থিক সহায়তা তহবিলে বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, প্রাইম মুভারের বার্ষিক চাঁদা ১ হাজার ৫০০ টাকা। মিনিবাস, মিনিট্রাক, পিকআপের বার্ষিক চাঁদা ৭৫০ টাকা। কার, জিপ, মাইক্রোবাসের চাঁদা ৫০০ টাকা। তিন চাকার ও অন্যান্য যানবাহনের চাঁদা ৩০০ টাকা। নিবন্ধনের সময় মোটরসাইকেলের এককালীন চাঁদা ১ হাজার টাকা। দুর্ঘটনার ৩০ দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণের আবেদন করতে হয়। আর্থিক সহায়তা তহবিল দেখভালের দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থাটির ট্রাস্টি বোর্ড তদন্ত করে ক্ষতিপূরণ দেয়। 


 

আরও পড়ুন

×