ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ব্রাজিলে আজ কপ৩০ শুরু

জলবায়ু ন্যায়বিচার ও নতুন তহবিলে আশা দেখছে বাংলাদেশ

জলবায়ু ন্যায়বিচার ও নতুন তহবিলে আশা দেখছে বাংলাদেশ
×

জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২৫ | ০৯:১৫

ব্রাজিলের বেলেম শহরে আজ সোমবার শুরু হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবায়ু সম্মেলন– ৩০তম কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ (কপ৩০)। আমাজন বনের পাদদেশে আয়োজিত জাতিসংঘের এই বৈশ্বিক সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন ১৫০ দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, এনজিও কর্মী ও গণমাধ্যম প্রতিনিধি। আগামী ২১ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে এই সম্মেলন। 

বাংলাদেশসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য এবারের সম্মেলন তাৎপর্যপূর্ণ হলেও রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থায়নের ঘাটতি ও বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার অভাবের কারণে প্রত্যাশার মাত্রা আগের চেয়ে অনেক কম। বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এবারও অংশ নিচ্ছে স্পষ্ট অবস্থান ও পাঁচটি অগ্রাধিকারমূলক লক্ষ্য সামনে রেখে। জলবায়ু ন্যায়বিচার, অভিযোজন সহায়তা এবং ন্যায্য বৈশ্বিক অর্থায়ন এই তিন ইস্যুই আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।

এরই মধ্যে ঢাকা থেকে সরকারি প্রতিনিধি দল বেলেমের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। এবার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ১২ এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দুজন কর্মকর্তা সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। পাশাপাশি এনজিও, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম থেকেও অংশ নিচ্ছেন বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি। এবারের প্রতিনিধি দলে নেই প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও সচিব ফারহিনা আহমেদ।

বাংলাদেশের পাঁচটি অগ্রাধিকার লক্ষ্য হলো– ২০৩৫ সালের মধ্যে বছরে ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নতুন বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন লক্ষ্য নির্ধারণ; ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ তহবিল (লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড) ২০২৬ সালের মধ্যে চালু করা, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো সরাসরি অর্থায়ন পায়; ২০২৫ সালের মধ্যে অভিযোজন অর্থায়ন দ্বিগুণ করা, বিশেষত নারী ও তরুণ নেতৃত্বাধীন প্রকল্পে; কর্মসংস্থান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ঘিরে ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করা এবং ভুটান ও নেপালের সঙ্গে সীমান্তবর্তী জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানো।

সেন্টার ফর ক্লাইমেট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের (সিসিইইআর) সহকারী পরিচালক রওফা খানম বলেন, বাংলাদেশের মানুষ বৈশ্বিক নিষ্ক্রিয়তার মূল্য দিচ্ছে। এখন আর প্রতিশ্রুতির সময় নয়, আমরা চাই জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, কপে বাংলাদেশকে পরিষ্কার করে বলতে হবে– আমরা কী চাই: অর্থায়ন, অভিযোজন, না প্রযুক্তি হস্তান্তর। 

তিনি বলেন, জলবায়ু অর্থায়নে সরাসরি প্রবেশাধিকারই বাংলাদেশের মূল দাবি হওয়া উচিত। ক্ষয়ক্ষতি তহবিলে সরাসরি অর্থ প্রবেশাধিকার না থাকলে প্রতিশ্রুতিগুলো শুধু প্রতীকী হয়ে থাকবে।

ড. নিশাত দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্বও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, নদী ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিময় ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষিতে একসঙ্গে কাজ করার মধ্য দিয়েই টেকসই পথ বের করা সম্ভব। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত নয়, উদ্ভাবনী ও সহনশীল জাতি হিসেবে তুলে ধরতে হবে। ভাসমান কৃষি থেকে সাইক্লোন আশ্রয়কেন্দ্র– আমাদের অভিযোজন কৌশলগুলো বিশ্বে উদাহরণ হতে পারে।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা কপ৩০ শুরুর আগে বলেছেন, বেলেম হবে সত্যিকারের কপ; যেখানে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব কাজের রূপরেখা তৈরি হবে।

তবে জলবায়ু কূটনীতিকদের মতে, সম্মেলনের আগে থেকেই স্পষ্ট– ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখার মতো কোনো বড় সাফল্য কপ৩০ থেকে আসা কঠিন।

বাংলাদেশ উন্নত দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে, প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়নের অঙ্গীকার পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে। সেই অর্থকে ‘নিউ কালেক্টিভ কোয়ান্টিফাইড গোল’-এর ভিত্তি ধরে ২০৩৫ সালের মধ্যে বছরে ৩০০ বিলিয়ন ডলার এবং মোট ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থায়ন নিশ্চিত করার প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা।

বাংলাদেশের দাবি– এই অর্থ হতে হবে অনুদানভিত্তিক, ঋণ নয়; অগ্রাধিকার পাবে অভিযোজন, ক্ষতি-ক্ষতিপূরণ ও স্থানীয়ভাবে পরিচালিত প্রকল্প। সরকারি অর্থের অন্তত ৫০ শতাংশ অভিযোজনের জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে, যাতে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি বাস্তবায়ন ও মালিকানা নিতে পারে।

বাংলাদেশ অভিযোজন কমিটির কার্যক্রমের প্রশংসা করেছে এবং এর সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। যাতে উন্নয়নশীল দেশগুলো সরাসরি অর্থ, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা সহায়তা পায়। দেশটি বলেছে, এখন পরিকল্পনা নয়– সময় এসেছে বাস্তবায়নের।

লিঙ্গ সমতা, অন্তর্ভুক্তি ও স্বচ্ছ অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা। কপ২৬-এর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, অভিযোজন অর্থায়ন দ্বিগুণ এবং ইউএনএফসিসিসি কাঠামোর আওতায় আর্থিক প্রবাহ তিন গুণ করার দাবি জানানো হয়েছে, যাতে কেউ পিছিয়ে না থাকে। 

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মির্জা শওকত আলী বলেন, বাংলাদেশের মতে, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় বর্তমান প্রতিশ্রুত অর্থ প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রতুল। ২০২৬ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে সরাসরি অর্থপ্রাপ্তির সুযোগ দিতে হবে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, জলবায়ু অর্থায়নে বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে। উন্নত দেশগুলো যদি নিজেদের অবদান বাড়াতে না পারে, তাহলে আমাদের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর বাঁচার পথ রুদ্ধ হবে।

আরও পড়ুন

×