আশ্বাসে মামলা তুলে এখন পেনশন পাচ্ছেন না বিমানের ৮২৩ কর্মী
ফাইল ছবি
শহিদুল আলম
প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫৯ | আপডেট: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১১:৩৪
সরকার ঘোষিত পুনঃপেনশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকার অভিযোগ তুলেছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী। তারা বলছেন, বিমানের সাবেক পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের আশ্বাসে উচ্চ আদালতের মামলা (রিট পিটিশন) প্রত্যাহারের পরও সরকার ঘোষিত সুবিধা বাস্তবায়ন করা হয়নি। এতে প্রতারণার শিকার হয়েছেন ৮২৩ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী। এদিকে বিমান কর্তৃপক্ষ বলছে, রাজস্ব খাতের আওতায় বেতন-ভাতা না পাওয়ায় বিমানের কর্মীদের নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী পেনশন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না।
২০১৭ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী এককালীন পেনশন গ্রহণ করেছেন, তারা ১৫ বছর পর পুনরায় পেনশন পাওয়ার অধিকারী হবেন। এই সিদ্ধান্ত সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে কার্যকর রয়েছে।
বিমানের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ১৯৮৮ সাল থেকে পেনশন সুবিধা ভোগ করে আসছেন। তবে যারা এককালীন শতভাগ পেনশন গ্রহণ করেছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে সরকারের দেওয়া বিশেষ সুবিধা কার্যকর হয়নি। অথচ একই অবস্থানে থাকা অন্যান্য সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্তরা সেই সুবিধা পাচ্ছেন নিয়মিত।
ভুক্তভোগীরা জানান, ২০০৭ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করে সরকার। যদিও এর শতভাগ শেয়ার এখনও সরকারের মালিকানায় রয়েছে। সোনালী, জনতা, অগ্রণীসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোই এসব শেয়ারের মালিক, যার একটিও বিক্রি হয়নি। বাস্তবে বিমান একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবেই পরিচালিত হচ্ছে।
জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর বেতন-ভাতা সাধারণত নিজস্ব আয়ের মাধ্যমে মেটানো হয়। সে কারণে বিষয়টি ওই কোম্পানি পরিচালনা বোর্ড নির্ধারণ করে থাকে। তাই এককালীন উত্তোলনের পর ১৫ বছর পার হয়ে যাওয়াদের পুনরায় পেনশনের বিষয়টি বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ড. সাফিকুর রহমান বলেন, রাজস্ব খাতের অধীন বেতন-ভাতার না পাওয়ায় বিমানের কর্মীদের নতুন প্রজ্ঞাপন
অনুযায়ী পেনশন সুবিধা দেওয়ার বিষয় বোর্ডে অনুমোদন হয়নি। বোর্ডে বিষয়টি তোলা হলে বোর্ড সদস্যরা বলেন, বিমান নিজস্ব বেতন কাঠামোতে পরিচালিত হয়। এজন্য পেনশনের বিষয়টি নাকচ করে দেওয়া হয়েছে।
১৯৭২ সালে ‘এয়ার বাংলা ইন্টারন্যাশনাল’ নামে বিমানের যাত্রা শুরু। পরবর্তী সময়ে নাম হয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। শুরু থেকেই বিমান কেনা-বেচা, লিজ, রুট নির্ধারণসহ সব সিদ্ধান্ত সরকারই নিয়ে আসছে। নীতিনির্ধারণী বোর্ডেও পদাধিকারবলে সচিব ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রাধান্য রয়েছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালকও সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত। ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশে বিমান করপোরেশনে এবং পরে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর হলেও এর নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানা পুরোপুরি সরকারের হাতেই রয়ে গেছে। একই ধরনের সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে যেখানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন কার্যকর, সেখানে শুধু বিমানের ক্ষেত্রে কেন তা মানা হচ্ছে না–এই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
অবসরপ্রাপ্ত কর্মীরা বলছেন, আইনি লড়াই থেকে সরে এসে তারা সরকারের আশ্বাসে বিশ্বাস করেছিলেন। সেই বিশ্বাসের মূল্য দিতে হয়েছে তাদের জীবনযাপনের নিরাপত্তা হারিয়ে। এ বিষয়ে সরকারের স্পষ্ট সিদ্ধান্ত ও হস্তক্ষেপ ছাড়া সংকটের সমাধান হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভুক্তভোগীরা বলছেন, সরকারের ঘোষিত নীতির বাস্তবায়ন না হলে তারা আবারও আইনি পথে যাওয়ার কথা ভাবছেন।
অবসরপ্রাপ্ত বিমান কর্মকর্তাদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব রিটায়ার্ড বিমান অফিসার্সের সহসভাপতি গোলাম জিলানী খান বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, পেট্রোবাংলা, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি ব্যাংক, ডেসাসহ বহু প্রতিষ্ঠানে ১৫ বছর পর পেনশন চালু রয়েছে। শুধু বিমানই এর বাইরে।
সংগঠনটির সভাপতি রুহুল আমনি তরফদার বলেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন জারির পর আমরা উচ্চ আদালতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। রায় বাস্তবায়নের সময় বিমানের তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান আমাদের ডেকে বলেন– মামলা তুলে নিলে সরকার ঘোষিত পেনশন সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। সেই আশ্বাসে আমরা মামলা প্রত্যাহার করি। আজ পর্যন্ত কোনো সুবিধা পাইনি।’
তিনি জানান, এই সিদ্ধান্তে প্রতারিত হয়েছেন ৮২৩ জন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী। যারা একসময় শতভাগ পেনশন সমর্পণ করেছিলেন।
বিমানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিমানের সাধারণ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখনও মাসিক চিকিৎসা ভাতা, বার্ষিক বোনাসসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। কিন্তু সরকার ঘোষিত পেনশন সুবিধা শুধু এই একটি শ্রেণির ক্ষেত্রে বন্ধ রাখা হয়েছে।
- বিষয় :
- পেনশন
- বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স
