ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জিএফআইর প্রাক্কলন

বাণিজ্যের আড়ালে বছরে পাচার ৮৩ হাজার কোটি টাকা

বাণিজ্যের আড়ালে বছরে পাচার ৮৩ হাজার কোটি টাকা
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৪৬

আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের আড়ালে গত ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে রেকর্ড ছয় হাজার ৮৩০ কোটি ডলার (৬৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার) বিদেশে পাচার হয়েছে। এর বড় অংশ, প্রায় তিন হাজার ৩০০ কোটি ডলার উন্নত অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের সময় পাচার হয়েছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) এশিয়ার দেশগুলোর বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার বিষয়ে সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে এমন  প্রাক্কলন করেছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এই অর্থের পরিমাণ আট লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। এই হিসাবে বছরে গড়ে পাচার ৮৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। 

জিএফআইর প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যের  প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৬৮৩ কোটি ডলার পাচারের প্রাক্কলন করা  হয়েছে, যা দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ১৫ দশমিক ৮৬ শতাংশের সমান। মূলত একটি দেশ তার কোনো বাণিজ্যিক অংশীদার দেশের সঙ্গে লেনদেনের যে তথ্য দেয়, তার বিপরীতে সেই অংশীদার দেশ ওই একই লেনদেনের যে তথ্য দেয়, তার মধ্যে তুলনা করে বাণিজ্য মূল্যের তফাত হিসাব করা হয়। যদি দেখা যায়, দুই দেশের দেওয়া তথ্যে বড় ধরনের ও স্থায়ী অমিল রয়েছে, তবে সেই অমিল বা ব্যবধানকে ‘ভ্যালু গ্যাপ’ বা অর্থ পাচারের সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করে জিএফআই।

বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের মূল্য বা পরিমাণের মিথ্যা তথ্য দেওয়ার মাধ্যমে (ট্রেড মিস-ইনভয়েসিং) এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সরানো হয়েছে। আমদানিতে অতিরিক্ত মূল্য (ওভার ইনভয়েসিং) এবং রপ্তানিতে কম মূল্য (আন্ডার ইনভয়েসিং) দেখানোর মাধ্যমে এই কারসাজি করা হয়।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার  গঠিত  শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে প্রাক্কলন করা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে (২০০৯-২০২৩) প্রায় ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। তৎকালীন বিনিময় মূল্য অনুযায়ী যার পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা। মূলত দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং আমলাদের যোগসাজশে এই বিশাল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে গেছে। পাচারকৃত অর্থ ও পাচারকারীদের শনাক্ত করতে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার বিশেষ উদ্যোগ নেয়। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো একত্রে কাজ করছে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়।

এশিয়া অঞ্চলের শীর্ষ ১০ দেশ

এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচারের দিক থেকে শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। জিএফআইর হিসাবে ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৯৬ ট্রিলিয়ন ডলার পাচার নিয়ে শীর্ষে ছিল চীন। এর পরের অবস্থানে থাকা থাইল্যান্ড থেকে ১ দশমিক ১৮ ট্রিলিয়ন ডলার, ভারত থেকে ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার, মালয়েশিয়া থেকে প্রায় ৮৭২ বিলিয়ন ডলার, ভিয়েতনাম থেকে ৬১৬ বিলিয়ন ডলার, ইন্দোনেশিয়া থেকে ৫৫০ বিলিয়ন ডলার, ফিলিপাইন থেকে ২৮৮ বিলিয়ন ডলার, মিয়ানমার থেকে প্রায় ৭৮ বিলিয়ন ডলার এবং কম্বোডিয়া থেকে ৭৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে বলে প্রাক্কলন করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থ পাচারের দিক থেকে ভারত সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। জিএফআইর হিসাবে ভারতের মোট বাণিজ্যের প্রায় ২২ শতাংশ আড়ালে পাচার হয়। 

জিএফআই বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার বন্ধে শুল্ক কর্তৃপক্ষকে আধুনিক প্রযুক্তি ও ডেটা অ্যানালিটিকস ব্যবহার করে পণ্যের মূল্যের অসামঞ্জস্যতা শনাক্ত করতে জোর সুপারিশ করেছে। 

আরও পড়ুন

×