কারখানায় আগুনে নিহত ৬
‘একমাত্র সন্তান আমাকে ছেড়ে চলে গেল’
শ্রমিকদের অভিযোগ, প্রধান ফটকে তালা ছিল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৪১ | আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১০:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘আগুন লাগার খবর পেয়ে আমি কারখানার সামনে ছুটে যাই। মেয়েকে উদ্ধারের জন্য ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করি, কিন্তু গেট বন্ধ ছিল। বাইরে দাঁড়িয়ে কারখানা পুড়তে দেখেছি। আমার একমাত্র সন্তান আমাকে ছেড়ে চলে গেল।’
গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) মর্গে মেয়ে মীম আক্তারের (১৬) লাশ শনাক্তের পর বিলাপের সুরে এসব কথা বলেন দেলোয়ার হোসেন। তিন বছর আগে তার স্ত্রীও মারা গেছেন।
গতকাল দুপুরে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কদমতলীর আমবাগিচা এলাকায় একটি গ্যাসলাইটার তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে মীম আক্তারসহ ছয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে শুধু মীমের লাশ শনাক্ত করা গেছে। বাকি চারজনের মরদেহ এতটাই পুড়েছে যে, তাদের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। এমনকি মরদেহগুলো নারী না পুরুষ– তাও নির্ধারণ করা যায়নি। লাশগুলো মিটফোর্ড মর্গে রাখা হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
এ ঘটনায় আহত ও দগ্ধ হয়েছেন আরও কয়েকজন। দগ্ধ দুই শ্রমিককে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক শাওন বিন রহমান জানান, দগ্ধদের মধ্যে মো. জিসান নামে একজনের শরীরের ২২ শতাংশ ও মো. আসিফের ১৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। এদিকে হতাহতদের পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের পরিচালককে (অপা. ও মেইন) প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
বেঁচে ফেরা শ্রমিকদের অভিযোগ, অগ্নিকাণ্ডের সময় কারখানার প্রধান ফটক তালাবদ্ধ ছিল। ফলে শ্রমিকরা সবাই দ্রুত বের হতে পারেননি। তখন ভেতরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তারা বাঁচার জন্য চিৎকার করছিলেন। অনেকেই বের হওয়ার জন্য বিকল্প পথ খুঁজতে থাকেন। কিছুক্ষণ পর ফটকটি খোলা হয়। কারখানায় অন্তত ১৮ জন শ্রমিক ছিলেন।
মীমের বাবা দেলোয়ার হোসেন জানান, তিনি কেরানীগঞ্জের একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মী। বাড়ি বরিশালে। কেরানীগঞ্জে আমবাগিচা এলাকায় পরিবার নিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। দারোয়ানের চাকরি করি। একার উপার্জনে ঘর ভাড়া দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছিল। তাই একমাত্র মেয়েকে পাঁচ মাস আগে গ্যাসলাইটার কারখানায় কাজে দিয়েছিলাম। কাজে না দিলে আজ তাকে হারাতে হতো না।’
অগ্নিকাণ্ডে বেঁচে যান ১২ বছর বয়সী এক কিশোরী। মেয়েটি জানায়, সে কারখানায় কাজ করছিল। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে কারখানা থেকে বের হওয়ার জন্য দৌড় দেয়। কিন্তু গেটের কাছে পৌঁছে দেখে সেটি বন্ধ। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর বাইরে থেকে গেটটি খোলা হলে নিরাপদে বেরিয়ে আসে। আট মাস ধরে সে ওই কারখানায় কাজ করছিল।
সন্ধ্যায় দুই ব্যক্তি স্বজনের লাশ শনাক্ত করতে মিটফোর্ড মর্গে যান। তবে চারটি লাশের কোনোটি তারা শনাক্ত করতে পারেননি। তারা জানান, গ্যাসলাইটার কারখানার শ্রমিক শাহিনুর (৩৫) ও মঞ্জু বেগম (৪৯) নিখোঁজ আছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কারখানার ভেতরে দাহ্য গ্যাস ও রাসায়নিক পদার্থ মজুত থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। টিনশেডের কারখানাটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেখানে কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না।
ফায়ার সার্ভিস সদরদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে জানানো হয়, দুপুর ১টা ১১ মিনিটে তারা আমবাগিচায় গ্যাসলাইটার তৈরির টিনশেডের কারখানায় আগুন লাগার খবর পান। এর পর পর্যায়ক্রমে ফায়ার সার্ভিসের ৭টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। সোয়া এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। বিকেল পৌনে ৫টায় আগুন নেভানো হয়। তল্লাশি চালিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পাঁচজনের পোড়া মরদেহ উদ্ধার করেন। পুড়ে অঙ্গার চারজনের মরদেহ চেনার উপায় নেই। গতকাল রাত ১২টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তল্লাশি কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি সাইফুল আলম জানান, বিকেলে পাঁচজনের লাশ অজ্ঞাত হিসেবে মিটফোর্ড মর্গে পাঠানো হয়। সন্ধ্যায় একজনের লাশ শনাক্ত হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়ার পর বাকি চারজনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
এলাকাবাসী জানান, আবাসিক এলাকায় গড়ে ওঠা কারখানাটিতে দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসলাইটার তৈরি করা হচ্ছিল। বছরখানেক আগেও অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল। তখন এলাকাবাসী কারখানাটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য দাবি তোলে। কিন্তু মালিকপক্ষ সেটা সরায়নি। আক্তার হোসেন নামে এক ব্যক্তি ওই কারখানার মালিক।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কারখানায় শ্রমিকরা কাজ করছিলেন। দুপুর ১টার পর হঠাৎ ধোঁয়া দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে থাকে। এ সময় কারখানার ভেতরে বিকট শব্দ হয়। এতে আশপাশ এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। জাতীয় জরুরি সেবা-৯৯৯-এর মাধ্যমে ফায়ার সার্ভিসে খবর জানানো হয়। এর পরই কেরানীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। পরে আরও কয়েকটি ইউনিট এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। প্রচণ্ড কালো ধোঁয়া বের হয়। কারখানাটিতে থাকা দাহ্য রাসায়নিক পদার্থের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। উৎসুক জনতা ভিড় করে। ঘটনার পর পুলিশ উপস্থিত হয়ে তাদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দেয়।
ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক ছালেহ উদ্দিন সমকালকে বলেন, কারখানায় বিপুল পরিমাণ গ্যাসলাইটার, গ্যাস সিলিন্ডার ও লাইটার তৈরির প্লাস্টিক দানা ছিল। এ কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। মরদেহগুলো নারী না পুরুষের তা বোঝা যাচ্ছে না।
সন্ধ্যা ৬টার দিকে মা মঞ্জু বেগমের খোঁজে কারখানার গেটে আসেন সাব্বির নামে এক তরুণ। মায়ের সন্ধান না পেয়ে তিনি বলেন, ‘আমার মা সকালে কারখানায় আসে। দুপুরে আগুন লাগে। এরপর কী হয়েছে জানি না। এখনও মায়ের খোঁজ পাইনি।’ সন্ধ্যা ৭টার দিকে তিনি মিটফোর্ড মর্গে গিয়ে চার লাশের মধ্য থেকে তাঁর মাকে শনাক্ত করতে পারেননি। সাগর হোসেন নামে আরেক ব্যক্তিও তার বোন শাহিনুর আক্তারকে খুঁজে পাচ্ছেন না। তার বোন ওই কারখানার শ্রমিক ছিলেন। কুলসুম বেগম নামের এক নারী কারখানাটির সামনে আর্তনাদ করছিলেন। তিনি আমি আমার ছেলেকে ফেরত চাই।’
দোষীদের শাস্তির নির্দেশ ও হতাহতদের পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ প্রধানমন্ত্রীর
কেরানীগঞ্জের কদমতলীতে গ্যাসলাইটার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের কারণ তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগুনে হতাহতের ঘটনায় অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও ক্ষতি অপূরণীয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ ঘটনায় তিনি গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন। তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার কারণ অবিলম্বে খুঁজে বের করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
দুর্ঘটনার খবর জানার পর পরই স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। দুর্ঘটনায় আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন তিনি।
বাসস জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিহত ও আহতদের পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছেন। গতকাল রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এ কথা জানান। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘নিহতদের পরিবারকে শ্রম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দুই লাখ করে টাকা দেওয়া হবে। কারখানাটির মালিক ও সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হবে। আহতদের চিকিৎসার জন্য সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’
- বিষয় :
- আগুনে পুড়ে মৃত্যু
- নিহত
