ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

বিহঙ্গ

বাদামি-ডানা মাছরাঙার গল্প

বাদামি-ডানা মাছরাঙার গল্প
×
×

সুন্দরবনের কালাবগীর হাটডোরা খালপাড়ের গাছে বাদামি-ডানা মাছরাঙা লেখক

ড. আ ন ম আমিনুর রহমান

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৫৪ | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ১২:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

মহাবিপন্ন গোলবনের রহস্যময় সুন্দরী হাঁসের সন্ধানে মোংলা থেকে ছোট্ট লঞ্চ ‘আলোর কোল’-এ করে ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর রাত ১২টা নাগাদ খুলনা রেঞ্জের কালাবগী ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্রের উদ্দেশে রওনা হলাম। ‘আলোর কোল’ সকাল ৮টা নাগাদ কালাবগী পৌঁছে গেল। ওখান থেকে হাটডোরা খালের ঠোঁটা বা মুখে পৌঁছাতে আরও এক ঘণ্টা। লঞ্চ হাটডোরা খালের মুখে নোঙর করল। ওখান থেকে লঞ্চের সঙ্গে থাকা নৌকাযোগে খালের ভেতর ঢুকলাম। এরপর ধীরে ধীরে মহাবিপন্ন পাখিটি খুঁজতে খুঁজতে সামনের দিকে এগোতে থাকলাম। দুপুর পর্যন্ত পাখিটি খুঁজলাম; কিন্তু হদিস পেলাম না। 

লঞ্চে ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে আবারও খালে ঢুকলাম। সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও কোনো কাজ হলো না। পরদিন সকালে আবারও অভিযান চালালাম। কিন্তু ফলাফলের উন্নতি হলো না। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। 

তবে গোলবনের রহস্যময় সুন্দরী হাঁস খুঁজে না পেলেও এই দেড় দিনে অন্তত ৩০-৩৫ প্রজাতির পাখির দেখা পেয়েছি। তাদের মধ্যে ২৪ প্রজাতির ছবি তুলতে পেরেছি। এগুলোর মধ্যে বেশ কিছু বিরল ও দুর্লভ পাখিও ছিল। 

এই দেড় দিনে খাল ও খাঁড়িজুড়ে একটি পাখি সব সময় আমাদের ছবি তোলায় ব্যস্ত রেখেছিল। ওকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় লোনাজলের বন ও সুন্দরবন ছাড়া দেশের আর কোথাও দেখা যায় না। এককথায় বাদাবন বা লোনাবনই হলো ওর আবাস্থল। বাদামি-কমলা পালকের অতি সুন্দর পাখিটিকে প্রায় প্রতিটি খাল বা খাঁড়িপাড়ের গাছের ডালে বসে থাকতে দেখা যায়। ড্যাগারের মতো ঠোঁটটি নিয়ে তার দৃষ্টি থাকে সব সময় পানির দিকে। সুযোগ পেলেই তীব্র বেগে পানিতে ডাইভ মেরে মাছ শিকার করে অন্য কোনো গাছের ডালে বসে আয়েশ করে খায়।

কালাবগীর হাটডোরা খালজুড়ে দেড় দিন ধরে যে পাখিটি আমাদের ছবি তোলায় ব্যস্ত রেখেছিল, সে আর কেউ নয়; এ দেশের এক সচরাচর দৃশ্যমান ও সংকটাপন্ন পাখি বাদামি-ডানা মাছরাঙা। থোড়মোচা বা বাদামি মাছরাঙা নামেও পরিচিত। হঠাৎ দেখায় কলার মোচার মতো মনে হয় বলে হয়তো ওর নাম থোড়মোচা মাছরাঙা। তবে এই নামটি আমার বেশ পছন্দ। 

ইংরেজি নাম Brown-winged Kingfisher। এ দেশের মাছরাঙাগুলোর মধ্যে আকারে সে দ্বিতীয় বৃহত্তম। Alcedinidae (অ্যালসেডিনিডি) গোত্রভুক্ত পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Pelargopsis amauroptera (পেলারগপসিস আমরপ্টেরা)। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের সুন্দরবন এবং মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার উপকূলীয় অঞ্চল পর্যন্ত ওরা বিস্তৃত। বর্তমানে বিশ্বে এটি প্রায় শঙ্কাগ্রস্ত বলে বিবেচিত।

ঠোঁটের আগা থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত দৈর্ঘ্যে থোড়মোচা মাছরাঙা ৩৬ সেন্টিমিটার। ওজন ১৬২ গ্রাম। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথা, ঘাড়, গলা, বুক, পেট ও লেজের তলা কমলা-বাদামি। পিঠ ও কোমর নীল। ডানা ও কাঁধ-ঢাকনি কালচে-বাদামি, তবে ডানার কিনারার পালকগুলো গাঢ় বাদামি। চোখ বাদামি ও চোখের পাতা ইটের মতো লাল। পা ও পায়ের পাতা লাল। প্রকাণ্ড লাল ঠোঁটের আগা ঘন কালচে-বাদামি। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহে কমলার আধিক্য। ডানার পালক-ঢাকনি ও কাঁধ-ঢাকনির কিনারা ফিকে। দেহতল কালো ও ঘাড়ে কালো ডোরা রয়েছে। 

থোড়মোচা মাছরাঙা মূলত একাকী থাকে, তবে অনেক সময় জোড়ায় দেখা যায়। পানির সামান্য ওপর দিয়ে দ্রুত উড়ে চলে। মূল খাদ্য ছোট মাছ হলেও কাঁকড়া ও জলজ পোকমাকড়ও খেতে পারে। সচরাচর শিস দিয়ে ‘চৌ-চৌ-চৌ-চৌ’ শব্দে ডাকে। তবে বিরক্ত হলে উঁচু স্বরে কর্কশ গলায় ‘চাক-চাক-চাক-চাক’ শব্দে ডাকতে ডাকতে উড়ে চলে যায়। 

মার্চ থেকে এপ্রিল প্রজননকাল। এ সময় নদী-খালের খাড়া পাড়ে ৩০-৬০ সেন্টিমিটার লম্বা ও ১০ সেন্টিমিটার চওড়া সুড়ঙ্গ তৈরি করে বাসা বানায় এবং তাতে ২-৫টি গোলাকার সাদা রঙের ডিম পাড়ে। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে ২০-২২ দিন তা দিয়ে ডিম থেকে ছানা ফোটায়। বাবা-মা উভয়েই পালাক্রমে ছানাদের খাওয়ায় ও যত্ন করে। ছানারা ২৫-৩০ দিনে উড়তে শিখে। প্রায় ১০ বছর বাঁচে। 
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন
ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন

×