বিহঙ্গ
প্রায়-শঙ্কাগ্রস্ত ফুলটুসীর দেখা
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের মান্দার গাছের টকটকে লাল ফুলে পুরুষ ফুলটুসী
ড. আ ন ম আমিনুর রহমান
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৫৩ | আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
১৩ বছর আগের ঘটনা। ২৭ এপ্রিল ২০১৩। দুপুরে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে গেলাম। বিকেল ও রাতে বনে ঘোরাফেরা করলাম। বন থেকে ফিরে শরীর ম্যাজম্যাজ করতে লাগল ও সারারাত প্রচণ্ড জ্বরে ভুগলাম। মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে গেলে দেখি বাইরে প্রচণ্ড ঝড়। ভোররাতের দিকে ঝড়ের তাণ্ডব শেষ হলো। ঘাম দিয়ে জ্বরও সারল। সকাল ৭টায় বিছানা থেকে উঠলাম। শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে।
নাশতা সেরে ক্যামেরা হাতে বের হলাম। দু-তিন প্রজাতির নতুন পাখির ছবি তুলে হাঁটতে হাঁটতে মসজিদের কাছাকাছি চলে এলাম। এমন সময় রাস্তার পাশের একটি নাচনা গাছে নতুন প্রজাতির কিছু টিয়া পাখিকে ব্যস্তভাবে ফল খেতে দেখলাম। এদের প্রায় সবই ছিল স্ত্রী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক।
ঠিক পাঁচ বছর পর অর্থাৎ ৬ মার্চ ২০১৮-তে সাতছড়ির টাওয়ারে উঠলাম মান্দার গাছের টকটকে লাল ফুলে ওদের ছবি তোলার জন্য। কিন্তু পাকা দুঘণ্টা অপেক্ষা করেও মান্দার গাছে ওদের আসতে দেখলাম না। অগত্যা টাওয়ার থেকে নিচে নেমে বনের গহিনে অবস্থিত ছোট্ট এক পুকুরে যাওয়ার পথ ধরলাম। পথের শুরুতেই মাটিতে প্রচুর মান্দার ফুল পড়ে থাকতে দেখলাম; একেবারে তাজা। ওপরে তাকিয়ে দেখি, সদলবলে টিয়াগুলো ফুলের পাপড়ি খাচ্ছে। টাওয়ারে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তার অভাবে হয়তো ওরা বিকল্প গাছ খুঁজে নিয়েছে। এবার মহা আনন্দে বেগুনি-লাল মাথার পুরুষ পাখিগুলোর ছবি তুলতে পারলাম।
মান্দার ফুলের পাপড়ি খাওয়ায় মত্ত বেগুনি-লাল মাথার এই টিয়াগুলো এদেশের বিরল ও প্রায়-শঙ্কাগ্রস্ত আবাসিক পাখি ফুলটুসী। ফরিয়াদি, টুই, কইরিদি টিয়া বা ফুলমাথা টিয়া নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Blossom-headed Parakeet বা Assam Blossom-headed Parakeet। সিটাসিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Psittacula roseata (সিটাকুলা রোসিয়েটা)। বাংলাদেশ ছাড়াও চীনসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভন্ন দেশে ওরা বিস্তৃত।
একনজরে ফুলটুসী দেখতে হীরামন টিয়ার মতো। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের দৈর্ঘ্য ৩০-৩৬ সেন্টিমিটার; ওজন ৮০-৮৫ গ্রাম। স্ত্রী-পুরুষের পালকের রঙে পার্থক্য রয়েছে। পুরুষের মাথা বাদে পুরো দেহ মোটামুটি সবুজ। মাথা ফ্যাকাসে বেগুনি-লাল যা ঘাড়-গলায় গিয়ে কালো সরু বন্ধনীতে শেষ হয়েছে। এই কালো সরু বন্ধনী চিবুকের কালো গোঁফের মতো দাগের সঙ্গে মিশে গেছে। স্ত্রীর ধূসর মাথা বাদে বাকি দেহ মোটামুটি সবুজ। ঘাড়-গলা হলুদাভ সবুজ এবং চিবুকে কোনো দাগ নেই। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে চোখ হলুদ। ওপরের ঠোঁট হলুদ ও নিচেরটা কালো। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল সবুজাভ ধূসর বা গাঢ় ধূসর। তুলনামূলক খাটো নীলাভ সবুজ লেজের আগা হলদে। উভয়েরই কাঁধে রয়েছে লাল পট্টি। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে মায়ের মতো হলেও মাথা সবুজ। হীরামন টিয়ার সঙ্গে ওদের মূল পার্থক্য হলো, অপেক্ষাকৃত খাটো লেজ যার আগা হলদে, পুরুষের মাথা কম লাল ও স্ত্রীর কাঁধে লাল পট্টির উপস্থিতি।
ফুলটুসী সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বন এবং খুলনার সুন্দরবনে বাস করে। দিবাচর ও বৃক্ষচারী পাখিগুলো সচরাচর ছোট থেকে মাঝারি দলে বিচরণ করে। শস্যদানা, ফল, কুঁড়ি, ফুলের পাপড়ি ও মধুরেণু খায়। ওড়ার সময় বারবার ‘টুউই-টুউই-টুউই’ শব্দে ডাকে।
জানুয়ারি থেকে এপ্রিল প্রজননকাল। এ সময় ওরা গাছের খোঁড়লে বাসা বাঁধে। প্রায়ই কাঠঠোকরা, বসন্তবৌরি বা অন্যান্য খোঁড়লবাসী পাখির বাসা দখল করে নিজেদের মতো সাজিয়ে নেয়। স্ত্রী ৪-৫টি সাদা রঙের ডিম পাড়ে। বাসা বানানো ও ডিমে তা দেওয়ার কাজ স্ত্রী একাই করে। পুরুষ বাসা পাহারা দেয় ও ডিমে তা দেওয়ার সময় স্ত্রীকে খাইয়ে দেয়। ডিম ফোটে ২২-২৪ দিনে। ছানারা ৪২-৫০ দিনে উড়তে শিখে। আয়ুষ্কাল ৭-৮ বছর, তবে আবদ্ধাবস্থায় ১৫-২০ বছর পর্যন্ত বাঁচে।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
- বিষয় :
- বিহঙ্গ