ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রদর্শনী

ইস্পাত ও কালির বয়ানে আত্মিক অনুসন্ধান

ইস্পাত ও কালির বয়ানে আত্মিক অনুসন্ধান
×

‘ রেখা-গড়ন-স্থিতি ভাস্কর্য ও ড্রয়িং’ প্রদর্শনীতে এক দর্শনাথী -সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩৫ | আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

কঠিন স্টিলের গায়ে ওয়েল্ডিংয়ের আঁকাবাঁকা দাগ, ঢালাই লোহার কৃষ্ণবর্ণ আদিমতা আর সাদা কাগজের বুকে কালির অসংকোচ আঁচড়– সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এমন এক দৃশ্যমান মেটাফোর, যা মানুষকে তার ভেতরের গহিন অস্তিত্বের দ্বৈততা ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাকুলতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। একটি জংধরা ধাতব পাত আর তাতে পেনসিলের আঁচড় কীভাবে শুধু সৌন্দর্যের সীমা ছাড়িয়ে চেতনার গভীরতায় রূপ নেয়, তার সার্থক উদাহরণ তৌফিকুর রহমানের হাতে গড়া শিল্পকর্মগুলো। দীর্ঘ সময়জুড়ে সৃষ্ট তাঁর ভাস্কর্য ও ড্রয়িংয়ের এই জগৎ রূপের সৌন্দর্য ছড়ানোর পাশাপাশি ধারণ করেছে এক গভীর জীবনদর্শনের পাঠ।

ধাতুর শীতলতাকে মানবীয় উত্তাপে রূপান্তর করার এই অনন্য প্রয়াস রূপ লাভ করেছে লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্রে আয়োজিত ‘রেখা-গড়ন-স্থিতি ভাস্কর্য ও ড্রয়িং’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে। শিল্পী ওয়াকিলুর রহমানের কিউরেশনে এই একক প্রদর্শনী শুরু হয় গত ১১ সেপ্টেম্বর। প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া শিল্পকর্মগুলোর রূপ ও ভাবগত বিন্যাসে দেখা যায়, এখানে মূলত ১০টি ভাস্কর্য ও ২০টি ড্রয়িংয়ের এক অখণ্ড সংলাপ তৈরি হয়েছে।

প্রদর্শনীতে ঢুকলে প্রথমেই মনোজগতে আলোড়ন তোলে ‘চিরন্তন কবি’ শীর্ষক বিশালাকার স্টিলের ভাস্কর্যটি, যা ২০১৭ থেকে এ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ পথপরিক্রমায় পূর্ণতা পেয়েছে। খণ্ড খণ্ড পাত ও ওয়েল্ডিংয়ের জোড়াতালিতে গড়ে ওঠা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুখাবয়বটি শুধু ব্যক্তির প্রতিকৃতি নয়; বরং যুগ যুগ ধরে বয়ে চলা সংবেদনশীল মানসচেতনতার এক অবিনশ্বর স্মারক। পাশেই দেখা মেলে ‘দ্বৈত সত্তা’ ও ‘মনোযোগের বিচ্যুতি’ নামে দুটি কাজ। যেখানে ‘দ্বৈত সত্তা’ প্রকাশ করে মানুষের অন্তর্জগতে সদা বিরাজমান দ্বিমুখী সংঘাতকে, আর ‘মনোযোগের বিচ্যুতি’ আধুনিক যন্ত্রমুখী জীবনের খণ্ডবিখণ্ড মানসিক বাস্তবতাকে জ্যামিতিক ভাঙনে রূপ দেয়। পক্ষান্তরে, ‘মাতৃত্ব’ ও ছোট আকারের ঢালাই লোহার ‘ছাগল’ ভাস্কর্য দুটিতে ফুটে উঠেছে সৃষ্টির আদিম উর্বরতা, মমতা এবং গৃহপালিত অস্তিত্বের নিঃসঙ্গ করুণতা।

মানুষের পরনির্ভরশীলতার মনস্তাত্ত্বিক রূপ ফুটে উঠেছে ‘নির্ভরতা’ ভাস্কর্যে। আর শৃঙ্খল ভেঙে খাঁচামুক্ত হওয়ার অদম্য আকুতি প্রকাশিত হয়েছে ‘পাখি সত্তা’ শিল্পকর্মে। মানবদেহের সঙ্গে প্রকৃতির জৈবিক সংশ্লেষণ ও রূপান্তর ফুটে উঠেছে ‘যৌগিক পুরুষ’ ও ‘যৌগিক নারী’ ভাস্কর্য দুটোতে। আর দুই স্বতন্ত্র সত্তার একীভূত হয়ে যাওয়ার এক চূড়ান্ত দার্শনিক মুহূর্ত ধরা পড়েছে ‘মিশে যাওয়া’ শীর্ষক শিল্পকর্মটিতে।

ভাস্কর্যের এই ত্রিমাত্রিক শারীরিকতার পাশাপাশি প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া ২০টি ড্রয়িং যেন মানসপটের অবদমিত কল্পনার নগ্ন উন্মোচন। এ বছর অঙ্কিত ‘অনুক্ত অন্ধকার’ সিরিজের ১০টি ড্রয়িংয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট আকৃতি নেই, সেখানে অ্যাক্রিলিকের গাঢ় কালো আঁচড়গুলো যেন সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার মতো মানুষের গোপন ভয়, অপরাধবোধ ও অব্যক্ত বেদনার মনস্তাত্ত্বিক ম্যাপ তৈরি করেছে। 
প্রদর্শনীটি গত ২৭ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দর্শকের আগ্রহে এর সময়সীমা আগামী ৫ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে গ্যালারি। 

আরও পড়ুন

×