ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আইনশৃঙ্খলা

মাদক, কিশোর গ্যাং চাঁদাবাজ দমনে ‘ভিন্ন’ অভিযানের চিন্তা

উদাহরণ হিসেবে ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ আলোচনায়

মাদক, কিশোর গ্যাং চাঁদাবাজ দমনে ‘ভিন্ন’ অভিযানের চিন্তা
×

 সাহাদাত হোসেন পরশ

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৯ | আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ ও মাদক দমনে ‘ভিন্ন’ ধরনের একটি বড় অভিযানের চিন্তা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ২০০২ সালে বিএনপি সরকারের সময় চালানো ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’কে এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে সামনে রাখা হচ্ছে। গত কয়েক দিনে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক একাধিক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। 

গতকাল সোমবার দায়িত্বশীল কয়েকটি সূত্র থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ‘ভিন্ন’ ধরনের এ অভিযান কোনো নাম ব্যবহার করে, নাকি নাম ছাড়া চালানো হবে– তা নিয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে মত রয়েছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সবুজ সংকেত পেলে দেশব্যাপী অভিযানের পথনির্দেশিকা চূড়ান্ত করা হবে। চলতি সপ্তাহে এ ব্যাপারে পরবর্তী করণীয় নিয়ে বৈঠক হতে পারে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সূত্র বলছে, অপরাধ নির্মূলে শক্ত পদক্ষেপ দৃশ্যমান করতে চান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীতিনির্ধারকরা। পরিস্থিতি যেন আরও খারাপের দিকে না যায়, তার জন্য জোরালো পদক্ষেপ নিতে চান তারা। ‘ভিন্ন’ ধরনের অভিযানের বিষয়টি চূড়ান্ত হলে তার একটি উদ্দেশ্য হবে অপরাধীদের বড় ধরনের বার্তা দেওয়া।

সম্প্রতি পরপর কয়েকটি ঘটনা জনমনে উদ্বেগ ও নিরাপত্তার শঙ্কা তৈরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কুমিল্লার ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড। ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিম নিখোঁজ হয়। পরদিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ হত্যার সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে এসেছে। 

কুমিল্লার ঘটনার রেশ না কাটতেই ঢাকায় বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে পরবর্তী ৪৭ ঘণ্টায় চারটি পৃথক স্থানে হামলা, দখলচেষ্টা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

মিরপুর-১ নম্বরে গরিবের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেয় দুইশ থেকে আড়াইশ লোক। শনিবার রাত ১১টার দিকে ইসিবি চত্বরে নিউগিনি প্রপার্টিজে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, গুলি, ভাঙচুর, লুটপাটের পর আশপাশের কয়েকটি বাড়িসহ স্থাপনায় হামলা হয়। এ ছাড়া মোহাম্মদপুর ও আদাবরে বাড়ি ও জমি দখলের চেষ্টা হয়েছে। প্রতিটি ঘটনায় হামলাকারীরা দলবদ্ধভাবে এসেছিল। ট্রাক ও ভারী যন্ত্রসহ দীর্ঘ সময় ধরে তারা হামলা চালায়।

ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের ঘটনার প্রেক্ষাপটে নতুনভাবে অভিযানের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানিয়েছে। গত রোববার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক বিবৃতিতে জানায়, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; ২০২৪ সালের আগস্টের পরের ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতা। সরকার এখনই কার্যকর আত্মশুদ্ধিমূলক পদক্ষেপ না নিলে দখলবাজি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যার পর কিশোর গ্যাং সদস্যদের গ্রেপ্তারে দেশের বেশ কিছু জেলায় অভিযান জোরদার করা হয়েছে। পুলিশের অভ্যন্তরীণ বৈঠকে এ বিষয়ে জোরালো ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। তবে নতুনভাবে যে অভিযানের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে, সেখানে কিশোর গ্যাং ছাড়া চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের দমনের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে এ ধরনের বিষয়টি ভাবনায় থাকলেও এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। শেষ পর্যন্ত তারা নতুনভাবে অভিযানে যাবেন কিনা বা গেলেও দিনক্ষণ ঠিক করে এর রূপরেখা কী হবে, তা নির্ধারণ করবেন। 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা জানান, অভিযানের বিষয়টি আলোচনায় আসার পর এর নাম দেওয়া হবে কিনা, তা নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য এসেছে। একটি ভাষ্য, কোনো নাম দিয়ে বড় ধরনের অভিযান শেষে সেটি ব্যর্থ বা সমালোচনার মুখে পড়লে বছরের পর বছর ওই নাম নেতিবাচক প্রচারণার অংশ হয়।

বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারের মেয়াদে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু অভিযান চালানো হয়েছিল। ২০০২ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকারের সময় ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ নামে অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী। ওই বছরের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ৮৪ দিন এ অভিযান চলে। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিডিআর (বর্তমান বিজিবি), পুলিশ ও আনসার সদস্যরা অভিযানে অংশ নেন। প্রায় ১২ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার এবং দুই হাজারের বেশি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এ সময় হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনের  অভিযোগও ওঠে। অভিযানটিকে দায়মুক্তি দিয়ে  দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।

২০১৮ সালে মাদক দমনে ‘বিশেষ অভিযান’ চালানো হয়। ২০১৯ সালে ক্যাসিনো ও দুর্নীতিবিরোধী ‘শুদ্ধি অভিযান’ চালানো হয়। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কয়েক দফা ঘোষণা দিয়ে অভিযান চালানো হয়। লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে তথ্যদাতার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।

পুলিশ সূত্র বলছে, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীর তালিকা পুলিশের কাছে রয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন তথ্যের ভিত্তিতে তালিকা হালনাগাদ করা হয়। সারাদেশে সক্রিয় কিশোর গ্যাং নিয়ে সম্প্রতি তালিকা করে পুলিশ সদরদপ্তর। 

পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী বাদে দেশের বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় ২২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এসব গ্যাংয়ের সদস্য সংখ্যা ২ হাজার ৫৫০। এসব গ্যাংয়ের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে আছে ৯৮টি। এ ছাড়া খুলনা মহানগরে ৭, রাজশাহীতে ১৩, সিলেটে ১৫ ও গাজীপুর মহানগরে ১৩টি গ্যাং রয়েছে। অন্য মহানগর ও বিভিন্ন জেলা শহরেও বেশ কিছু গ্যাং সক্রিয়। জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি রয়েছে নোয়াখালীতে– ২৫টি। 

রাজধানীতে ১৫৯টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ১ হাজার ৮১২ জন। এর মধ্যে মোহাম্মদপুরে সর্বোচ্চ ২৭টি কিশোর গ্যাং আছে। এসব গ্যাংয়ে সদস্য সংখ্যা সাড়ে ৩০০। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৬টি পল্লবী থানা এলাকায়। এসব কিশোর গ্যাংয়ে সদস্য সংখ্যা ১৬০। 

রাজধানীকেন্দ্রিক মাদক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ৪০৬ জন মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকের বিরুদ্ধে একযোগে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। পুলিশ সদরদপ্তরের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে এ কার্যক্রম শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মানি লন্ডারিং ইউনিট। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর পুলিশের তালিকায় রাজধানীতে চাঁদাবাজি ও জমি-সম্পত্তি দখলে জড়িত এক হাজার ৫৩০ জনের নাম রয়েছে। 

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন গতকাল সমকালকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাবনতি, বেপরোয়া সন্ত্রাসী তৎপরতা ও মব সন্ত্রাস করে দেশকে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির দিকে নেওয়ার চেষ্টা করছে একটি মহল। কিশোর গ্যাংয়ের নতুন নতুন তৎপরতাও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। দেশের জনগণের জানমাল রক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির স্বার্থে যৌথ অভিযান পরিচালনা জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ধরনের অভিযান পরিচালনায় মানবাধিকার রক্ষায় সতর্ক থাকতে হবে। 

পুলিশ সদরদপ্তরের মুখপাত্র এআইজি শাহাদাত হোসাইন সমকালকে বলেন, কিশোর গ্যাং, মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজসহ বিভিন্ন অপরাধীর বিরুদ্ধে পুলিশ সব সময় অভিযান চালায়। আজকাল চলচ্চিত্র আর ওটিটি প্ল্যাটফর্ম– এই গ্যাং ভায়োলেন্সকে আকর্ষণীয়, বীরত্বপূর্ণ, ইতিবাচকভাবে দেখানোয় অনেক কিশোর অপরাধে জড়াতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। এ ধরনের অপরাধ বন্ধে সমাজের সবার ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

×