রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় জমি দখল-চাঁদাবাজির অভিযোগ, ৩৮ নাগরিকের উদ্বেগ
ছবি-সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯:৪১
দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভূমি ও বাড়িঘর দখল, হামলা, চাঁদাবাজি ও লুটপাটের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ৩৮ জন নাগরিক। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
মঙ্গলবার দেওয়া এক বিবৃতিতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক ও পেশিশক্তির প্রভাব খাটিয়ে ভূমি দখল, বাড়িঘরে হামলা ও চরাঞ্চলের খাসজমি দখলের মতো ঘটনা ঘটছে। এতে জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
বিবৃতিতে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের বরাত দিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় ভূমি ও বাড়ি দখল, খাসজমি দখল এবং বাড়িঘরে হামলার একাধিক ঘটনা তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রাজধানীর মিরপুর-১ এলাকার রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিবৃতিদাতারা বলেন, ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য মাতৃ ও শিশুসেবা দিয়ে আসছে। বর্তমানে সেখানে শিশুদের টিকাদান, শিশু স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছিল।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে কয়েক শ লোকের হামলা ও ভাঙচুরের মাধ্যমে জমি দখলের অভিযোগের কথাও বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়। তাঁদের দাবি, গাবতলী-সদরঘাট বাইপাস সড়কের পাশে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ ও সাতমসজিদ হাউজিং-সংলগ্ন এলাকায় কয়েক ঘণ্টা ধরে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। এ সময় নগদ অর্থ, জমির দলিল, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, দরজা-জানালা ও আসবাবসহ বিভিন্ন মালামাল লুটের অভিযোগ রয়েছে।
ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে’ হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে চাঁদার টাকা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে হামলা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে বলে জানান তাঁরা।
দেশের বিভিন্ন চরাঞ্চলের পরিস্থিতিও বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়। পটুয়াখালীর চরবাংলা, নোয়াখালীর সদর উপজেলার ভাটিরটেক ও চরফ্যাশন এবং ভোলার বিভিন্ন চরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভূমিহীনদের উচ্ছেদ ও জমি দখলের অভিযোগের কথা উল্লেখ করেন তাঁরা। কোথাও কোথাও জমিতে থাকা ফসলও লুট করা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ঢাকা মহানগরসহ দেশের বিভিন্ন বড় ও ছোট শহরে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েছে। পাশাপাশি শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা ও নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনক। কোনো কোনো এলাকায় পুলিশ কর্তৃপক্ষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করে সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের পরামর্শ দিতে দেখা গেছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
৩৮ নাগরিকের অভিযোগ, এসব ঘটনার সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী মহল, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে কখনও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নিজস্ব বাহিনী, আবার কখনও ভাড়াটে লোকজন ব্যবহার করে এসব ঘটনা ঘটানোর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও কোথাও রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকায় পুলিশ যথাসময়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারছে না বলেও দাবি করা হয়।
নাগরিকেরা বলেন, এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিচয় যেন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত ও উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের পাশাপাশি তাঁদের পৃষ্ঠপোষক ও মদদদাতাদের চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়, সামগ্রিকভাবে সরকারেরও এসব ঘটনার বিষয়ে জবাবদিহির দায়িত্ব রয়েছে।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ, মানবাধিকার কর্মী ও মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির, নারীপক্ষের সদস্য শিরীন পারভিন হক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, লেখক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, ব্লাস্টের অনারারি নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম এবং আলোকচিত্রী শহিদুল আলম।
এ ছাড়া এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন, অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের ভিজিটিং প্রফেসর ড. স্বপন আদনান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নোভা আহমেদ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ফিরদৌস আজিমসহ আরও অনেকে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন।
- বিষয় :
- বিবৃতি