হামলা, দখল, চাঁদাবাজি
৩৮ নাগরিকের উদ্বেগ, জড়িত সবার বিচার নিশ্চিত করার দাবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২৩:০৮
দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভূমি ও বাড়িঘর দখল, সন্ত্রাসী হামলা, চাঁদাবাজি ও লুটপাটের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশের ৩৮ জন নাগরিক। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক ও পেশিশক্তির প্রভাব খাটিয়ে ভূমি দখল, বাড়িঘরে হামলা, চরের খাসজমি দখলসহ বিভিন্ন ধরনের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রবণতা দৃশ্যমান হচ্ছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় ভূমি ও বাড়ি দখল, খাসজমি দখল এবং বাড়িঘরে হামলার একাধিক ঘটনার কথা জানা গেছে। এর মধ্যে রাজধানীর মিরপুর-১ এলাকার রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিদাতারা বলেন, ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য মাতৃ ও শিশুসেবা দিয়ে আসছে। বর্তমানে সেখানে শিশুদের টিকাদান, শিশু স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছিল।
এ ছাড়া রাজধানীর মোহাম্মদপুরে কয়েকশ লোকের হামলা ও ভাঙচুরের মাধ্যমে জমি দখলের অভিযোগের কথাও বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের দাবি, গাবতলী-সদরঘাট বাইপাস সড়কের পাশে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ ও সাতমসজিদ হাউজিং-সংলগ্ন এলাকায় কয়েক ঘণ্টা ধরে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। এ সময় নগদ অর্থ, জমির দলিল, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, দরজা-জানালা, আসবাবসহ বিভিন্ন মালপত্র লুটের অভিযোগ রয়েছে।
রাজধানীর ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে’ হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন চরাঞ্চলের পরিস্থিতির কথাও বিবৃতিতে তুলে ধরা হয়েছে। পটুয়াখালীর চরবাংলা, নোয়াখালীর সদর উপজেলার ভাটিরটেক ও চরফ্যাসন এবং ভোলার বিভিন্ন চরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভূমিহীনদের উচ্ছেদ ও জমি দখলের অভিযোগের কথা নাগরিকরা উল্লেখ করেন। তাদের দাবি, কোথাও কোথাও জমিতে থাকা ফসলও লুট করা হচ্ছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ঢাকা মহানগরসহ দেশের বিভিন্ন বড় ও ছোট শহরে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েছে। পাশাপাশি শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা ও নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনক বলে তারা উল্লেখ করেন। কোনো কোনো এলাকায় পুলিশ কর্তৃপক্ষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করে সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের পরামর্শ দিতে দেখা গেছে বলেও বিবৃতিতে বলা হয়।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
বিবৃতিতে ৩৮ নাগরিক অভিযোগ করেন, এসব ঘটনার সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী মহল, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তারা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে কখনও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নিজস্ব বাহিনী, আবার কখনও ভাড়াটে লোকজন ব্যবহার করে এসব ঘটনা ঘটানোর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও কোথাও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকায় পুলিশ যথাসময়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারছে না বলেও তারা দাবি করেন।
৩৮ নাগরিক বলেন, এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। তাদের মতে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিচয় যেন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। তারা এসব ঘটনার দ্রুত ও উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে বলেন, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের পাশাপাশি তাদের পৃষ্ঠপোষক ও মদদদাতাদেরও চিহ্নিত করতে হবে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিবৃতিদাতারা আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাদের ভাষ্য, শুধু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়, সামগ্রিকভাবে সরকারেরও এসব ঘটনার বিষয়ে জবাবদিহির দায়িত্ব রয়েছে।
বিবৃতিতে যারা স্বাক্ষর করেছেন
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, মানবাধিকার কর্মী ও মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির, নারীপক্ষের সদস্য শিরীন পারভিন হক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, লেখক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, ব্লাস্টের অনারারি নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম এবং আলোকচিত্রী শহিদুল আলম।
এ ছাড়া স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে আছেন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন, অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের ভিজিটিং প্রফেসর ড. স্বপন আদনান, লেখক রেহনুমা আহমেদ, নৃবিজ্ঞানী ও লেখক সাঈদ ফেরদৌস, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী, অধ্যাপক ও নিউরোলজিস্ট ডা. নায়লা খান, মানবাধিকারকর্মী মো. নুর খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নোভা আহমেদ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ফিরদৌস আজিম প্রমুখ।