ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

বিহঙ্গ

হঠাৎ দেখা সবুজ বক

হঠাৎ দেখা সবুজ বক
×
×

গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ উদ্যানের হ্রদের পাড়ে দেখা মেলে সবুজ বকের। গত ১৪ সেপ্টেম্বর তোলা লেখক

আ ন ম আমিনুর রহমান

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:০২ | আপডেট: ০২ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষ ফরেস্ট্রির ব্যবহারিক ক্লাসের অংশ হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের পাখি-প্রাণী চেনাতে ক্যাম্পাস ঘুরে বেড়াচ্ছি। গাছপালা সমৃদ্ধ এ ক্যাম্পাসে পাখি-প্রাণীর অভাব নেই। তবে শরতের গরমে গাছের ছায়া ছেড়ে কয়টি পাখি বাইরে বেরিয়ে আসে, সেটাই দেখার বিষয়। 

ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের পেছন দিক থেকে শুরু করলাম। এখানে প্রচুর ফলদ গাছ রয়েছে। বেশির ভাগ গাছ গত ১৬ বছর ধরে নিজ হাতে রোপণ করেছি। শুরুতেই কমলাফুলির দেখা পেলাম। কিন্তু দ্রুততার সঙ্গে চলে যাওয়ায় অতিসুন্দর পাখিটির ছবি তুলতে পারলাম না। এরপর বেশ কটি বাদামি কাঠবিড়ালিকে বড়ুই ও কাঁঠাল গাছে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখলাম। 

ভেটেরিনারি অনুষদের গণ্ডি পেরিয়ে ফরেস্ট্রি অনুষদের আমলকী বাগান, এরপর কলাবাগান পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ উদ্যানে ঢুকলাম বিকেল প্রায় পৌনে ৪টায়। উদ্যানে ঢোকার আগে ৪০ মিনিটে একে একে ভাত শালিক, ছোট পানকৌড়ি, তিলাঘুঘু, সাদা বক মাছরাঙা, কানিবক, ছোট সাদা বক, লাল-লতিকা হট্টিটিসহ ১১ প্রজাতির পাখির দেখা পেলাম। 

উদ্যানে ঢুকেই একটি ছোট মাছরাঙাকে মাছ শিকারের জন্য পানিতে ঝাঁপ দিতে দেখলাম। ওর ঝাঁপ দেওয়ার ছবি তুলে সামনে এগোতেই কালচে-সবুজ খোঁপাযুক্ত নীলচে-সবুজাভ ছোট্ট একটি বককে উদ্যানের কৃত্রিম হ্রদের পাড় দিয়ে অতি সন্তর্পণে হেঁটে যেতে দেখলাম। তার মাথার ছোট ঝুঁটিটি ফোলানো, কিছু উত্তেজিত মনে হলো পাখিটিকে। হয়তো সে শিকারের সন্ধান পেয়েছে, তাই এ রকম টান টান হয়ে সন্তর্পণে হেঁটে যাচ্ছে। বিকেলের এই মিষ্টি রোদে ওর পালকের রং চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে! গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এর আগে এই পাখিটিকে কখনও দেখিনি। 

এতক্ষণ যে ছোট্ট পাখিটির গল্প বললাম, সে এ দেশের বক পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য সবুজ বক। খুদে বক, ছোট বক বা কুঁড়ো বক নামেও পরিচিত। ইংরেজিতে Striated/ Mangrove/ Little/ Green-backed Heron নামে পরিচিত। Ardeidae (আরডেইডি) গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Butorides striata (বিউটোরাইডস স্ট্রায়াটা)। 

এটি এ দেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি এবং দেশের সর্বত্র বিস্তৃত হলেও অঞ্চলভেদে কোথাও সহজেই চোখে পড়ে, আবার কোথাও বেশ বিরল। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ভারতীয় উপমহাদেশ, চীন, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপাইনেও দেখা যায়। 

সবুজ বক এ দেশের সবচেয়ে ছোট বক। ঠোঁটের আগা থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ৪০-৪৫ সেন্টিমিটার। ওজন ১৯৩-২৩৫ গ্রাম। দেহের রং একনজরে নীলচে-সবুজ। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির পিঠের পালক নীলচে-সবুজ, পাড় সাদা। মাথার চাঁদির চকচকে কালচে-সবুজ ঝুঁটিটি পেছনের দিকে ঝুলে থাকে। মাথা ও ঘাড় ধূসর। গাল সাদা। চোখ উজ্জ্বল লেবু-হলুদ, চোখের পাতা সবুজ। ঠোঁটের গোড়া থেকে একটি কালো রেখা চোখের পেছনে চলে গেছে। পা ও পায়ের পাতা কালচে-সবুজ। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। অপ্রাপ্তবয়ষ্ক পাখির দেহের নিচটায় কালচে-বাদামি লম্বালম্বি দাগ থাকে। মাথা ধূসর-বাদামি। কাঁধ-ঢাকনিতে লম্বালম্বি পীতাভ দাগ ও ডানার পালক-ঢাকনিতে সাদা ফোঁটা দেখা যায়।  

সবুজ বক নোনাজলের সুন্দরবন, উপকূলীয় এলাকা, পাথুরে উপকূল, জলাভূমি, খাল, জলাশয়, নদী ও মোহনায় সচরাচর একা একা বিচরণ করে। ভোর ও গোধূলি এবং মেঘলা দিনে বেশি সক্রিয় থাকে। অগভীর পানির সামান্য ওপরে গাছের আড়ালে চুপচাপ অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে এবং সুঁচালো ঠোঁটের আঘাতে শিকার করে। ছোট মাছ, চিংড়ি বা এ জাতীয় প্রাণী, ব্যাঙ, জলজ পোকামাকড় ইত্যাদি খায়। ভয় পেলে বারবার “কে-ইয়েক—কে-ইয়েক—” স্বরে ডাকে। 

মার্চ থেকে জুলাই প্রজননকাল। এ সময় পুরুষ বক ঝুঁটি খাড়া করে, ঘাড় ফুলিয়ে, লেজ দুলিয়ে স্ত্রীকে ঘিরে দৌড়িয়ে তার প্রেম প্রকাশ করে। নদী ও পুকুরের ধারে ছোট গাছ বা ঝোপঝাড়ে পানির ওপর ঝুলে থাকা ডালে মাচার মতো বাসা বানায়। স্ত্রী তাতে ৩-৫টি ফ্যাকাশে সবুজাভ-নীল রঙের ডিম পাড়ে। স্ত্রী-পুরুষ উভয়ে মিলেমিশে ডিমে তা দেয়। ছানা বেরুতে ২১-২২ দিন সময় লাগে। মা-বাবা দুজনে মিলেমিশে ছানাদের খাওয়ায় ও লালনপালন করে। এরা বেশ দ্রুত বাড়ে; এক সপ্তাহে গাছের ডালে হাঁটাহাঁটি করে, দুই সপ্তাহে উড়তে শেখে ও বাসা ছাড়ে। আয়ুষ্কাল ৫-৮ বছর।

লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন

×