আলতাফ মাহমুদের স্মরণে ‘স্মৃতি ৭১’
‘সুর রয়ে গেছে, মানুষটি ফেরেননি’
ছবি: দ্রোহী তারা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ২২:২৬
শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদের হারিয়ে যাওয়া গান ও সুর খুঁজে বের করতে গবেষণা অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ‘স্মৃতি ৭১’। তার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, সহযোদ্ধাদের অভিজ্ঞতা ও সাংস্কৃতিক অবদান নিয়ে শনিবার বিকেলে রাজধানীর ছায়ানট মিলনায়তনে আয়োজিত এক স্মরণ অনুষ্ঠানে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে উঠে আসে একাত্তরের সেই ভয়াল দিনগুলোর কথাও, যখন পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পর আলতাফ মাহমুদ আর ফিরে আসেননি।
অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে ফারুক এইচ খান বলেন, আলতাফ মাহমুদের সৃষ্টির বড় একটি অংশ এখন হারিয়ে গেছে। কিছু গানের কোনো রেকর্ড নেই, আবার কিছু গান মানুষের স্মৃতি থেকেও ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। হারিয়ে যাওয়া এসব গান খুঁজে বের করতে গবেষক, সংগীতপ্রেমী ও তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
আলতাফ মাহমুদের জীবনের শেষ অধ্যায়টি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক গভীর বেদনাময় অংশ। ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট ভোরে ঢাকার বাসা থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তানি বাহিনী। এর আগে ২৯ আগস্ট গেরিলা যোদ্ধা বদি, রুমী, জুয়েল ও আজাদ আটক হন। তাদের একজনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরে আলতাফ মাহমুদের বাসায় অভিযান চালানো হয়। সেখানে অস্ত্র ও গোলাবারুদভর্তি একটি ট্রাঙ্ক পাওয়া যায়। এরপর তাকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। ধারণা করা হয়, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নাখালপাড়ার সেনা ক্যাম্পে নির্যাতনের পর তাকে হত্যা করা হয়। আটক অন্যদেরও একই পরিণতি হয়েছিল বলে বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে।
আলতাফ মাহমুদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সেই সময়টিতে যুক্ত ছিলেন চিত্রশিল্পী আবুল বারক আলভী, ব্যাংকার নাসের বখতিয়ার এবং সংগীতশিল্পী লীনু বিল্লাহ ও খনু বিল্লাহ। তাদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে গ্রেপ্তার, বন্দিত্ব, ভয় এবং মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার অভিজ্ঞতা।
আবুল বারক আলভী বলেন, আলতাফ মাহমুদের সুরের গান বাঙালির মুখে মুখে ফিরলেও তার জীবনের শেষ অধ্যায়টি অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। যারা ফিরে আসেননি, তাদের কথা বলার দায়িত্ব তাদের ওপরই রয়েছে, যারা সেই সময় বেঁচে ফিরেছেন।

নাসের বখতিয়ারের স্মৃতিতে একাত্তরের সেই ঘটনা আজও অমীমাংসিত। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, জীবনের দীর্ঘ সময় ব্যাংকে হিসাব মেলালেও একাত্তরের একটি হিসাব আজও মেলেনি। আমরা কেন ফিরে এলাম, আর আলতাফ মাহমুদ কেন ফিরলেন না। মুক্তিযুদ্ধের সময় আলতাফ মাহমুদ গান সৃষ্টি করে মানুষকে সাহস জুগিয়েছেন এবং নিজের বাসায় মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন বলেও স্মরণ করেন তিনি।
লীনু বিল্লাহ বলেন, একাত্তরের স্মৃতি এখনও আমাকে আবেগাপ্লুত করে। কিছু স্মৃতি গানে প্রকাশ করা যায় না, সেগুলো নিজের ভেতরেই বহন করতে হয়।
খনু বিল্লাহ বলেন, বেঁচে ফেরার সুযোগ পাওয়াকে শুধু সৌভাগ্য হিসেবে দেখলে হবে না; এর সঙ্গে একটি দায়ও রয়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে আলতাফ মাহমুদের গান যেমন পৌঁছে দিতে হবে, তেমনি তার জীবন ও মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকার কথাও জানাতে হবে।
ছায়ানটের সভাপতি ডা. সারওয়ার আলী বলেন, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। আলতাফ মাহমুদের জীবন তারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ফজলুল কবীর তুহিন বলেন, আলতাফ মাহমুদের মতো শিল্পীর জীবন ও কাজ নিয়ে আলোচনা একটি আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার নয়। এ ছাড়া ‘স্মৃতি ৭১’–এর মাহবুব জামান একাত্তরের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাগুলো সংরক্ষণ এবং সাক্ষীদের বক্তব্য নথিবদ্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেন।
অনুষ্ঠানে ‘হৃদয়ে একাত্তর’ নামের একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। আলতাফ মাহমুদ ও তার সহযোদ্ধাদের অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে মঞ্চস্থ হয় একটি নাটক। স্মৃতিচারণ পর্ব শেষে চার বক্তাকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন নদী গোমেজ, প্রিয়াংকা ও নৈরিতা রেজওয়ান। পরে আলতাফ মাহমুদের সুর করা গান পরিবেশন করেন লীনু বিল্লাহ, ফাউজিয়া আলফা ও শারমীন।
প্রসঙ্গক্রমে, ১৯৩৩ সালে বরিশালে জন্ম নেওয়া আলতাফ মাহমুদ ১৯৫০ সালে ঢাকায় এসে ‘ধূমকেতু শিল্পী সংঘ’–এ যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের দেশাত্মবোধক গানেও তার সুর ছিল। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৭৭ সালে তাকে মরণোত্তর একুশে পদক এবং ২০০৪ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়।
- বিষয় :
- ছায়ানট