ঢাকা সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

আরও ১৯৪ কিশোর আটক

সাদা কাগজে সই, নিয়ম না মেনে জিজ্ঞাসাবাদ

সাদা কাগজে সই, নিয়ম না মেনে জিজ্ঞাসাবাদ
×

চট্টগ্রামে আড্ডাস্থল থেকে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের আটক করা হয়। ছবি: ফাইল

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৩৫

সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে বের হয়েছিল ১৪ বছরের কিশোর সুমন। রাত ১১টা পেরিয়ে গেলেও বাড়ি না ফেরায় সন্তানের খোঁজে উদ্বিগ্ন মা তাহের বানু ছুটে যান থানায়। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, কয়েকজন বন্ধুসহ তাঁর ছেলেকে পুলিশ ধরে নিয়ে এসেছে। 

কী অপরাধ করেছে, তখনও তা পরিষ্কার ছিল না লক্ষ্মীপুর পৌরসভার এই বাসিন্দার কাছে। সন্তানকে ছাড়িয়ে নিতে তাঁকে শেষ পর্যন্ত সাদা কাগজে সই করতে হয়। আবার অভিভাবকসহ এসব কিশোরকে জিজ্ঞাসাবাদের ছবি-ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় সমাজসেবা কর্মকর্তা বা প্রবেশন অফিসার না রাখা এবং ছাড়িয়ে আনতে অভিভাবকদের হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে। 

সর্বশেষ গত শনিবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, চাঁদপুরে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে ১৯৪ জনকে আটক করা হয়েছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও চাঁদপুরে পাঁচ দফা পর্যন্ত এই অভিযানে তিন হাজার ২৩৪ জনকে আটক করা হয়। 

এরই মধ্যে গত শুক্রবার রাতে কুমিল্লার দাউদকান্দি থানা পুলিশের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। থানার ওসি সাজেদুল ইসলাম পলাশের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রায় ৯ মিনিটের ওই ভিডিও পোস্ট করা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, আটক কিশোরদের থানায় অভিভাবকদের পাশে দাঁড় করিয়ে নাম, পরিচয় এবং আটকের ঘটনাস্থল সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ সময় ওসিকে বলতে শোনা যায়, ‘কাউকে এক টাকাও দিবেন না, দিলে আল্লার কাছে ঠেকা থাকবেন।’ পাশাপাশি তিনি অভিভাবকদের সামনে দাঁড় করিয়ে নিজের ছেলেদের চুল ছোট করার নির্দেশও দেন। 

এভাবে প্রকাশ্যে কিশোরদের ভিডিও ধারণ ও ফেসবুকে প্রকাশ করা কতটা আইনসংগত– এমন প্রশ্নে ওসি সাজেদুল ইসলাম পলাশ বলেন, ‘অভিভাবকদের ভালো উদ্দেশ্যে তাদের সন্তানদের সামনে কিছু ভালো পরামর্শ দিয়েছি।’ 

ওসির ফেসবুকে আটক কিশোরদের ভিডিও পোস্ট করা ঠিক হয়নি বলে জানিয়েছেন জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান। তিনি সমকালকে বলেন, ‘এ বিষয়ে ওসিকে সতর্ক করে দেওয়া হবে।’ 

অপরাধ প্রমাণের আগেই কিশোরদের ছবি ও ভিডিও এভাবে ছড়িয়ে দেওয়ায় জনমনে এই অভিযান নিয়ে স্বস্তির পরিবর্তে আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। 

নোয়াখালীর সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন অফিসার শ্যামল পাল বলেন, যে কোনো অপরাধে শিশু-কিশোর আটক হলে থানা পুলিশ জেলা প্রবেশন অফিসারকে অবহিত করবে এবং তাঁর সামনে জিজ্ঞাসাবাদ করার বিধান রয়েছে। জেলা পুলিশের গত এক সপ্তাহের অভিযানে আটক কিশোরদের সম্পর্কে সমাজসেবা অধিদপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে। তবে তাদের সামনে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি।

সাদা কাগজে মুচলেকা ও হয়রানির অভিযোগ 

অভিভাবকদের বড় একটি অভিযোগ হলো, আটক কিশোরদের ছাড়িয়ে আনতে গেলে তাদের কাছ থেকে কোনো নির্ধারিত ফরমে নয়, বরং সাদা কাগজে স্বাক্ষর বা মুচলেকা নিয়ে সন্তানদের পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্মীপুরের এক অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘সাদা কাগজে সই করতে দেওয়া হয়েছে। সেখানে কী লেখা ছিল, তা পড়ার সুযোগ বা পরে কাগজের কপি আমাদের দেওয়া হয়নি। সন্তানকে নিয়ে চিন্তায় থাকায় আমরা সই করে তাকে নিয়ে বাড়ি চলে আসি।’ 

কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানার সামনে গত শনিবার দুপুরে ২৩ বছর বয়সী স্বামী রাকিবুল ইসলাম রিফাতকে ছাড়িয়ে নিতে অপেক্ষা করছিলেন স্ত্রী আকলিমা আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী পেশায় রাজমিস্ত্রি। শুক্রবার রাত ১০টার দিকে শহরতলির বালুতোপা এলাকা থেকে পুলিশ রিফাতকে কিশোর গ্যাং সন্দেহে ধরে নিয়ে আসে। তাঁর নামে কোনো মামলা নেই। পুলিশ তাঁকে ছাড়ছে না, দেখা করে পানি ও পাউরুটিও দিতে পারছি না।’ 

নগরীর নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া আটক ছাত্রের মা বলেন, ‘পুলিশের এ অভিযান চালু থাকুক। তবে নিরপরাধ ছেলেদের আটক করে যেন হয়রানি করা না হয়।’ 

আটক আরেক কিশোরের বাবা ব্যবসায়ী চান মিয়া বলেন, ‘সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ডিবি কার্যালয়ে চেষ্টা তদবির করে ছেলেকে মুক্ত করি। ছেলের কোনো অপরাধ ছিল না।’ 

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এনআরডিএসের নির্বাহী পরিচালক ও সমাজবিজ্ঞানী আবদুল আউয়াল বলেন, আমাদের সমাজে কিশোরদের মাঝে অপরাধে জড়িয়ে পড়া উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে। রাষ্ট্রের কিশোর অপরাধীদের সংশোধনের যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। 

তিনি বলেন, কিশোর-কিশোরীরা জন্মগতভাবে অপরাধী হয় না। তারা মূলত সমাজের পরিবেশ, পারিবারিক বিশৃঙ্খলা, দারিদ্র্য, সঙ্গদোষ বা সঠিক নির্দেশনার অভাবে অপরাধের পথ বেছে নেয়। এ জন্য তাদের শুধু অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন না করে, অপরাধের মূল সামাজিক কারণগুলোও চিহ্নিত করতে হবে। 

লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার আবু তারেক বলেন, কিশোর ও উঠতি বয়সী তরুণদের অপরাধ থেকে দূরে রাখা এবং সচেতন করার লক্ষ্যেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের অপ্রয়োজনীয় আড্ডা এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযান চালানো হয়েছে। 

জানা গেছে, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও চাঁদপুরে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে মোট তিন হাজার ২৩৪ জনকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে কুমিল্লায় গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া অভিযানে দুই হাজার ৪২ জনকে আটক করা হয়; যাদের এক হাজার ২০৯ জন মুচলেকায় মুক্ত হলেও ৮৩৩ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। 

লক্ষ্মীপুরে তিন দিনের অভিযানে ২৬৬ জনকে আটক করা হয়। এর মধ্যে ২১৫ জন মুচলেকায় ছাড়া পান এবং ৫১ জনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। অন্যদিকে, নোয়াখালীতে গত শনিবার রাতে ১৭০ জনসহ ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া অভিযানে মোট ৮৫১ জনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া চাঁদপুরের মতলব উত্তরে শনিবার সন্ধ্যার পর পরিচালিত অভিযানে ২১ কিশোরকে আটক করা হয়, যাদের পরিচয় যাচাই-বাছাই শেষে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। ফেনীর সোনাগাজী উপজেলায় একই অভিযানে ৫১ জনকে আটক করা হয়। 

এদিকে, চট্টগ্রামের খুলশীর জালালাবাদে অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাং নেতা ওয়াকিল হোসেন ওরফে বিহারী বগাকে নারী ও তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত শনিবার রাতে গ্রেপ্তারের পর গতকাল তাদের কারাগারে পাঠান আদালত। অন্য আসামিরা হলেন– মো. আবদুল হান্নান, মো. মনির হোসেন ওরফে ইমন ও সাবিহা বেগম। এর মধ্যে হান্নান ও ইমনের বিরুদ্ধে পাঁচ থেকে ছয়টি করে মামলা রয়েছে।

(তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি) 

আরও পড়ুন

×