সংবিধান সংশোধন কমিটির পঞ্চম বৈঠক
সংবিধানে বিভিন্ন জাতিসত্তার অধিকারের স্বীকৃতি দাবি
ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:৫৩
সংবিধান সংশোধনে শ্রমজীবী মানুষ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি, আদিবাসীদের ভূমির অধিকার এবং নারী-পুরুষ বৈষম্যসহ সব ধরনের বৈষম্য অবসানের বিষয় সংবিধানে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববার জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির পঞ্চম বৈঠকে এসব দাবি উঠে আসে।
বৈঠকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অবদান রাখা শ্রমজীবী মানুষ এবং ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে প্রস্তাব ও দাবি উত্থাপন করে প্রতিনিধিরা বলেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে শ্রমিক ও বিভিন্ন জাতিসত্তার আয়-মজুরি ও সম্পদ বৈষম্য দূর করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। উচ্চকক্ষে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও শ্রমিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের দাবিও তোলেন প্রতিনিধিরা।
এ সময় কমিটির পক্ষ থেকে বৈঠকের আলোচনার বাইরে কারও লিখিত প্রস্তাব থাকলে সেগুলো পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়। এতে বলা হয়, বৈঠকে উত্থাপিত এবং লিখিত প্রস্তাবগুলো কমিটির তৈরি রিপোর্টে উল্লেখ থাকবে।
সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য হিসেবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিব রহমান, সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, সংসদ সদস্য সাকিলা ফারজানা এবং মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ আমন্ত্রণে সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান, আন্না মিনজ এবং মাধবী মারমা বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন।
আরও যত দাবি
বৈঠকসূত্র জানায়, বৈঠকে আদিবাসী প্রতিনিধিরা সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে ব্যবহৃত ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’, ‘সম্প্রদায়’ ও ‘উপজাতি’ শব্দগুলো বিলুপ্ত করার দাবি জানান। এর পরিবর্তে তাদের ‘আদিবাসী’ অথবা ‘জনজাতি’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। তবে এসব প্রস্তাবের বিষয়ে কমিটির পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছেন বৈঠকে অংশ নেওয়া একটি সূত্র।
পাশাপাশি ১৯৭২ সালের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রীয়, সমবায় ও ব্যক্তিগত মালিকানার পাশাপাশি আদিবাসীদের প্রথাগত ও সমষ্টিগত ভূমি মালিকানার আইনি স্বীকৃতি সংযোজনের জোর দাবি তোলা হয়।
প্রতিনিধিরা জাতীয় সংসদে আদিবাসী, প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য সংসদের উচ্চকক্ষে সংরক্ষিত আসনের প্রস্তাব করেন। পাহাড় ও সমতলের সব ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জন্য আনুপাতিক হারে আসন বরাদ্দের দাবি পেশ করেন। সংরক্ষিত নারী আসনের মধ্যে সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি আসন চান তারা।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও সংস্কৃতিকর্মী সঞ্জীব দ্রং সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান সংবিধানের ৬-এর ২ ধারায় আছে, ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি বলে পরিচিত হবে।’ জুলাই সনদ অনুযায়ী এটি সংশোধন করে ‘বাংলাদেশের নাগরিকরা বাংলাদেশি বলে পরিচিত হবে’ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তারা বিষয়টি গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া সংবিধানে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ বলা আছে। তবে গারো, হাজংসহ বিভিন্ন জাতির মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশে রাষ্ট্রকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন জানান, বৈঠকে শ্রমিকদের কাজ, মজুরি ও মর্যাদাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়। মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই চেতনার মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্য থেকে মুক্তি। অথচ শ্রমিকদের আয়, মজুরি ও সম্পদে বৈষম্য রয়েছে।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাসলিমা আখতার বলেন, উচ্চকক্ষে শ্রমিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, তথ্য অধিকার, আদালত সংস্কার এবং স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের বিধিবিধান তৈরিতে শ্রমিক প্রতিনিধিদের যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ‘ছাত্র-শ্রমিক-জনতার’ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করার দাবি জানিয়েছি। কারণ এই আন্দোলনে শ্রমিকরা বড় অংশে প্রাণ দিয়েছেন।
সবার প্রস্তাবনা নিয়েই সুপারিশ করবে বিশেষ কমিটি
বৈঠকসূত্র জানায়, বৈঠকে বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমেদ সবার প্রস্তাবনাগুলো বিবেচনায় নিয়ে কমিটি তার সুপারিশ প্রণয়ন করবে বলে জানান। এ সময় আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, বাহাত্তরের সংবিধান, জুলাই জাতীয় সনদ এবং সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সুপারিশগুলো আমলে নিয়ে সংসদে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপন করবেন।
- বিষয় :
- সংবিধান সংস্কার কমিশন