পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে ৩ কমিটি বাতিলের দাবি
ছবি-সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১৯:৫০
সাম্প্রতিক চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে ৩টি আলাদা জাতীয় কমিটি বাতিলের দাবি জানিয়েছে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন’।
‘সাম্প্রতিক চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে তিনটি আলাদা জাতীয় কমিটি গঠনের প্রতিবাদে’ সোমবার রাজধানীর শাহবাগে আয়োজিত নাগরিক সমাবেশে এসব দাবি জানানো হয়।
সমাবেশে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা আবু সাইদ খান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষকে অনেক কিছু দেওয়া হয়েছে, এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কোনো দেশের কোনো জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন বঞ্চিত ও উপেক্ষিত থাকলে সেই দেশের রাষ্ট্রীয় চরিত্র নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ শুধু বাঙালির রাষ্ট্র নয়, শুধু মুসলমানের রাষ্ট্রও নয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম অশান্ত থাকলে সমগ্র বাংলাদেশও শান্তিতে থাকতে পারবে না। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা শুধু পাহাড়ের মানুষের সমস্যা নয়, এটি বাংলাদেশের জাতীয় সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
আবু সাইদ খান বলেন, পাহাড়ের মানুষ অস্ত্র ছেড়েছে বলে তাদের সঙ্গে যা ইচ্ছা করা যাবে, এমন ধারণা ভুল। পাহাড়ের শান্তিপ্রিয় মানুষকে শান্তিতে থাকতে দিতে হবে এবং তাদের আবার অস্ত্র ধরতে বাধ্য করা যাবে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে। পাহাড়ের মানুষের ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। সম্প্রতি গঠিত তিনটি কমিটি বাতিল করে চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী পক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান তিনি।
এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। সম্প্রতি গঠিত তিনটি কমিটি মূলত আমলা ও গোয়েন্দা-নির্ভর। এ ধরনের উদ্যোগ কোনোভাবেই কাম্য নয়।
তিনি বলেন, একদিকে সরকার ‘রেইনবো নেশন’-এর কথা বলছে, অন্যদিকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ, সার্কেল চিফসহ পাহাড়ের বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।
বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, দেশে আন্দোলন হচ্ছে, সরকার পরিবর্তন হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে বিশেষ করে আদিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটছে না। রাষ্ট্র পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের সঙ্গে চুক্তি করেছে, তাই সেই চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্বও রাষ্ট্রের। সম্প্রতি গঠিত তিনটি কমিটি বাতিল করে পাহাড়ের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে চুক্তি নয়, এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি। তাই চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্বও রাষ্ট্রের। পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান সমস্যা ভূমি সমস্যা হলেও দীর্ঘদিনেও এর কার্যকর সমাধান হয়নি।
তিনি বলেন, পাহাড়কে শুধু নিরাপত্তার দৃষ্টিতে না দেখে সেখানকার মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তব সমস্যাগুলো বুঝতে হবে। সম্প্রতি গঠিত তিনটি কমিটি কার্যক্রম শুরু করলে বিদ্যমান সমস্যাগুলো আরও জটিল হতে পারে।
ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষিত চাকমা বকুল বলেন, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের ২৯ বছর অতিবাহিত হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অবিলম্বে চুক্তি বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পাহাড়ের জনগণ গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে।
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে নিরাপত্তার দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা। তাই এর সমাধানও রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে ধারাবাহিক ২৬টি বৈঠকের পর ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও ২৯ বছর পরও এর মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান সরকারের কাছে পাহাড়ের জনগণের প্রত্যাশা ছিল চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া।
জাকির হোসেন বলেন, গত ১০ সেপ্টেম্বর সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয়, নির্বাহী ও পরামর্শক তিনটি কমিটি গঠন করেছে। এসব কমিটির কার্যপরিধিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং আইন ও বিধি সংস্কারের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দুটি কমিটির প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোগত সুবিধা ডিজিএফআই থেকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
সমাবেশ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক তিনটি কমিটি বাতিল, চুক্তি অনুযায়ী চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটি গঠন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অ-পাহাড়ী প্রতিমন্ত্রীকে প্রত্যাহার, মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ প্রদানের জন্য উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠন ও কার্যকর করার দাবি জানানো হয়।
এ ছাড়া চুক্তি বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট সময়সূচিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, বিধিমালা প্রণয়নসহ দ্রুত পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যকর, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সংলাপ এবং ভূমি সমস্যাসহ পাহাড়ের সব সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বহুপক্ষীয় অর্থবহ সংলাপ শুরুর দাবি জানানো হয়।
সমাবেশে বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজসহ সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
- বিষয় :
- পার্বত্য চট্টগ্রাম
- চুক্তি