ঢাকা মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬

‘প্লিজ আমাদের সাহায্য করেন’ বলা নারী তিন সন্তান নিয়ে এখনও আতঙ্কে

লুটপাটের পর নিজের বাসায় উঠতে ভয় পাচ্ছেন

‘প্লিজ আমাদের সাহায্য করেন’ বলা নারী তিন সন্তান নিয়ে এখনও আতঙ্কে
×

ছবি: সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেওয়া

সাহাদাত হোসেন পরশ

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ২৩:৩৩ | আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ২৩:৪৩

‘প্লিজ, আমাদের সাহায্য করেন। আল্লাহর কসম লাগে। ভাই, আপনাদের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকব। আমাদের সাহায্য করেন। আমার বাচ্চারা...। ৯৯৯-এ কল করেছি। পুলিশ এসে আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে গেছে। আল্লাহ, তুমি ছাড়া আমাদের বাঁচার কেউ নেই।’

ভয়ার্ত কণ্ঠে ফেসবুক পেজে লাইভে এসে এভাবেই বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন নওরীন মহসিন। ঘটনাটি গত ১৯ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে গাজীপুরের গাছা থানার কুনিয়া পাছর এলাকায়। সেদিন নিজের বাসায় অসহায় অবস্থায় তিন সন্তানকে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন নওরীন।

সেই রাতের ঘটনার পর এখনও স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন তিনি। ভয়ে গাজীপুরের বাসা ছেড়ে বর্তমানে ঢাকার মোহাম্মদপুরে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

নওরীন ও তার স্বামী ফুয়াদ আলম ফাহিম সমকালকে জানান, ছয় বছর আগে পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয়। গাজীপুরের বাসিন্দা ফাহিম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে চাকরির চেষ্টা করছেন। নওরীনের বাবা জাপানপ্রবাসী। তাদের সংসারে তিন সন্তান—বড় ছেলে মাহিরের বয়স সাড়ে চার বছর, মুনতাহার আড়াই বছর এবং মেহেরানের বয়স ছয় মাস।

বিয়ের পর থেকে গাজীপুরে শ্বশুর-শাশুড়ির বাসায় বসবাস করে আসছিলেন নওরীন। ২০১৯ সালে তার শ্বশুর মারা যান। ২০২২ সালে শাশুড়িও মারা যান। এরপর থেকে নওরীনের ননদ ফারজানা আলম শ্রাবণী পুরো বাড়ি দখলের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ নওরীনের।

নওরীন জানান, আট কাঠা জায়গার ওপর নির্মিত ওই বাড়িতে ছোট ছোট কক্ষ তৈরি করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। পোশাককর্মীদের জন্য নির্মিত চারতলা বাড়িটিতে ১২২টি ছোট কক্ষ রয়েছে। এসব কক্ষ থেকে মাসে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ভাড়া আসে। এর মধ্যে চার লাখ টাকা ননদ ভাড়া হিসেবে আদায় করে নিয়ে যান বলে দাবি তার।

নওরীনের অভিযোগ, গত ১৯ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে ১৭ থেকে ১৮ জন দুর্বৃত্ত চাপাতি, ছুরি, রড, স্টিলের পাইপ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে তাদের দোতলার বাসায় হামলা চালায়। তারা বাসার সিসি ক্যামেরা ও গেট ভাঙচুর করে। পরে নওরীন ও তার স্বামীকে মারধর করতে থাকে। একপর্যায়ে আলমারি ভেঙে ২১ ভরি স্বর্ণালংকার, নগদ ৯ লাখ ৬৫ হাজার টাকা, সোফা, জামাকাপড়সহ বাসার প্রায় সব মালপত্র লুট করে নিয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, ‘বিয়ের পর থেকে একটু একটু করে টাকা জমিয়ে ছোট্ট বাসার প্রতিটি কর্নার নিজের মতো করে সাজিয়েছি। এক রাতে সব তছনছ করে দিয়েছে। লুটপাটের এত দিন পার হলেও পুলিশ স্বর্ণালংকার বা অন্য কোনো মালপত্র উদ্ধার করতে পারেনি। কষ্টের টাকায় কেনা আমার অনেক জিনিসপত্র তারা নিয়ে গেছে। গাজীপুরে যেতেও ভয় পাচ্ছি। যারা হামলা করেছে, তাদের অধিকাংশই চেনাজানা। বাড়ির আশপাশেই তারা বসবাস করে।’

তিনি আরও জানান, ঘটনার রাতে ৯৯৯-এ কল করার প্রায় দেড় ঘণ্টা পর পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। এরপর উল্টো তার স্বামীকে ধরে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। এ সময় কয়েক ঘণ্টা ধরে হামলাকারীরা বিনা বাধায় বাসায় লুটপাট ও ভাঙচুর চালায়। পরদিন থানা থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ফাহিমকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

আসামিদের ভয়ে এখন গাজীপুরের বাসায় যাচ্ছেন না নওরীন ও তার পরিবার। তিন দিন আগে বাসার গেট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অল্প সময়ের জন্য সেখানে গেলে কাদের নামে এক ব্যক্তি তাকে হুমকি দেন বলে অভিযোগ নওরীনের। তিনি বলেন, ‘কয়েকবার জেলে গেছি। দরকার হলে তোদের মেরে আরেকবার যাব।’

নওরীনের অভিযোগ, ওই ব্যক্তি হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর তিনি জামিনে বের হয়েছেন। কাদেরের হুমকির পর তারা আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। হামলার পর নওরীনের ননদ কাদেরকে ভাড়াটে হিসেবে ব্যবহার করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ফাহিমের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাড়িতে লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় তাঁর বোন শ্রাবণীসহ ১৫ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। মামলায় আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।

ফাহিমের দাবি, তাদের বাবার রেখে যাওয়া গাজীপুরের বাড়ি এবং প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা মূল্যের একটি চাতাল একাই ভোগদখল করার চেষ্টা করছেন তার দুই বোন। স্থানীয় সন্ত্রাসী ও একটি প্রভাবশালী চক্রকে সঙ্গে নিয়ে তারা গাজীপুরের বাড়িটি একাই দখলের চেষ্টা করছেন। এ সময় স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকাসহ কোটি টাকার মালপত্র লুট করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তার।

তিনি আরও বলেন, ‘আমার শ্বশুর জাপানে থাকেন। আমার স্ত্রীও দীর্ঘদিন সেখানে ছিলেন। ভয় দেখালে স্ত্রী ও ছোট্ট তিন সন্তানকে নিয়ে আমরা দেশ ছেড়ে চলে যাব—এমন ভাবনা তাদের। এর আগেও কয়েক দফা হামলা চালানো হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে আমার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা থাকা অবস্থায়ও হামলা করা হয়। ওই ঘটনায় মামলা হয়েছিল।’

লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গাজীপুরের গাছা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান সমকালকে বলেন, লুণ্ঠিত মালপত্র উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। কয়েকজন আসামি আগাম জামিন নিয়েছেন। বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রাব্বানী সমকালকে বলেন, ‘পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব থেকেই ঘটনাটি ঘটেছে। আমরা জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছি। যাদের বাসায় হামলা ও লুটপাট হয়েছে, তাদের পুনরায় বাসা গুছিয়ে নিতে বলেছি।’

আরও পড়ুন

×