ঢাকা মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর

চেয়ার দখলের প্রতিযোগিতায় খামারবাড়িতে অস্থিরতা

পছন্দের লোক না হলে, কথা না শুনলে, চাঁদা বা অনৈতিক সুবিধা না দিলেই অপপ্রচার

চেয়ার দখলের প্রতিযোগিতায় খামারবাড়িতে অস্থিরতা
×

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর

 জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫১ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল নিয়ে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পছন্দের লোককে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো, বদলি-পদায়নে প্রভাব বিস্তার এবং দরপত্রে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য চলছে নানামুখী তৎপরতা। একটি পক্ষকে কাবু করতে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ তকমা দিয়ে পোস্টার বানিয়ে প্রচার চালানোর ঘটনাও ঘটছে। 

অধিদপ্তরের কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার ভাষ্য, প্রভাবশালী একটি চক্রের মনমতো না চললে কিংবা অনৈতিক সুবিধা না দিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ‘স্বৈরাচারের দোসর’ হিসেবে পরিচিত করার চেষ্ট হচ্ছে।
সর্বশেষ গতকাল সোমবার ডিএইর তিন কর্মকর্তার ছবি দিয়ে পোস্টার লাগানো হয়। পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ডিএইর কয়েকজন কর্মচারী পোস্টারগুলো নামাতে গেলে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) থেকে কিছু লোক এসে তাদের ধাওয়া দেয়। এর কিছুক্ষণ পর আবার ডিএইর কর্মচারীরা পোস্টারগুলো সরিয়ে নেন। 

এর আগে গত বুধবার ডিএইর প্রধান কার্যালয়ের আশপাশের দেয়ালে এসব কর্মকর্তার ছবি দিয়ে পোস্টার সাঁটানো হয়েছিল। এতে তাদের স্বৈরাচারের দোসর আখ্যা দিয়ে কৃষি খাতের স্বার্থে অপসারণের দাবি জানানো হয়। ‘জাতীয়তাবাদী সচেতন কৃষিবিদ সমাজ’-এর ব্যানারে লাগানো এসব পোস্টারে যাদের ছবি রয়েছে তারা হলেন– ডিএইর পরিকল্পনা উইংয়ের উপপরিচালক সাখাওয়াত হোসেন, প্রশাসন উইংয়ের উপপরিচালক মুরাদুল হাসান ও টিস্যু কালচার প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবায়ের মাশরুর।

ডিএইর কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা আওয়ামী লীগপন্থি কর্মকর্তাদের সরিয়ে বিএনপিপন্থিদের বসানো হয়। এখন নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখলে নেওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। প্রকল্প পরিচালকসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে নতুন কর্মকর্তা বসাতে কৃষি মন্ত্রণালয়ে চাপ দিচ্ছে একটি মহল। তদবিরে সফল না হয়ে এখন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পোস্টার লাগানো ও রাজনৈতিক তকমা দিচ্ছে।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কোনো কর্মকর্তা পছন্দের ব্যক্তিকে পদায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালে, তদবিরে সাড়া না দিলে কিংবা কোনো অনৈতিক সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ বানানোর চেষ্টা করা হয়।

পোস্টারে থাকা তিন কর্মকর্তার মধ্যে মুরাদুল হাসান শিক্ষাজীবনে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের প্যানেল থেকে ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যও ছিলেন। মুরাদুল হাসান বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশাসন উইংয়ের উপপরিচালক হিসেবে আমার পদায়ন হয়। একসময় ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, অথচ এখন আমাকে ফ্যাসিস্টের দোসর বলা হচ্ছে। মূলত কৃষি মন্ত্রণালয়ে চাপ সৃষ্টি করে আমার চেয়ার দখল করতে না পেরে একটি চক্র অপপ্রচারে নেমেছে।’

পোস্টারে থাকা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিকল্পনা উইংয়ের উপপরিচালক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমি পটুয়াখালী কৃষি কলেজে পড়াশোনার সময় ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। অথচ এখন স্বৈরাচারের দোসর তকমা দেওয়া হচ্ছে। মূলত চেয়ার দখলের জন্যই এসব হচ্ছে।’

টিস্যু কালচার প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবায়ের মাশরুর ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন বলে প্রচার করা হচ্ছে। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। সেখানে রাজনীতি করার সুযোগ নেই। 
প্রায় দেড় দশক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত মাশরুর কৃষিপ্রযুক্তি, তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা, টিস্যু কালচার, মিনি কোল্ডস্টোরেজ এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি উদ্যোগ নিয়ে কাজ করেছেন। কৃষিতে অবদানের জন্য তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছেন।

তালহা জুবায়ের মাশরুর সমকালকে বলেন, ‘কে কোন দায়িত্বে থাকবেন, সেটি সরকারের সিদ্ধান্ত। কোনো পদ আঁকড়ে থাকার মানসিকতা আমার নেই। তবে কাউকে দায়িত্ব থেকে সরানোর জন্য স্বৈরাচারের দোসর তকমা দেওয়া দুঃখজনক।’

ডিএইর কর্মকর্তাদের অভিযোগ, শুধু বদলি-পদায়ন নয়; বিভিন্ন প্রকল্পের পরিচালক পরিবর্তন নিয়েও একটি পক্ষ তৎপর। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এরই মধ্যে ১২ জন প্রকল্প পরিচালককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবার নতুন করে গত মাসে ১১ জন প্রকল্প পরিচালককে বদলির একটি তালিকা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কৃষিমন্ত্রী সেই নথি আটকে দেন। চাপ সৃষ্টি করে পদ থেকে সরাতে না পেরে এ ধরনের প্রচার চালানো হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মো. আসাদুল্লাহ বলেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ থাকলে অধিদপ্তরের ডিজির কাছে অভিযোগ দেওয়া যেতে পারে। এভাবে একজন কর্মকর্তাকে অপমান করা ঠিক নয়। কাজ, দক্ষতা ও প্রশাসনিক যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মকর্তাকে মূল্যায়ন করা না গেলে কৃষি খাতে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। 

জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম বলেন, কে বা কারা পোস্টার লাগিয়েছেন, তা এখনও শনাক্ত করা যায়নি। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু এভাবে কর্মকর্তাদের ছবি দিয়ে পোস্টার লাগানো ন্যক্কারজনক। 

অধিদপ্তরের তরফে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা– এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, পোস্টার লাগানো হয়েছে ডিএইর বাইরে। এ ছাড়া কারা এই পোস্টার লাগিয়েছে, তাও আমরা জানি না। যাদের ছবি দিয়ে পোস্টার লাগানো হয়েছে, তারা মানহানি মামলা করতে পারেন।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, বদলি কিংবা পদায়ন নিয়ম মেনেই হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না। চাপ সৃষ্টি করে কিছু করার সুযোগ নেই।

 

আরও পড়ুন

×