ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সমুদ্রের উচ্চতা ও মিঠাপানির সংকট বাংলাদেশের বড় ঝুঁকি

সমুদ্রের উচ্চতা ও মিঠাপানির সংকট বাংলাদেশের বড় ঝুঁকি
×
×

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের গাবুরা এলাকায় সুপেয় পানির দাবিতে কলসি নিয়ে নারীদের প্রতিবাদ। সম্প্রতি তোলা সমকাল

 জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪৫ | আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

জলবায়ু পরিবর্তনের কিছু প্রভাব আর ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে ভবিষ্যতে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কতটা হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে বিশ্ব কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেয় তার ওপর। বিশেষ করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া, মিঠাপানির সংকট, জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতির দায় নির্ধারণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর নিয়ে নতুন গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে।
‘১০ নিউ ইনসাইটস ইন ক্লাইমেট সায়েন্স ২০২৬-২০২৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জলবায়ু বিজ্ঞানের গত ১৮ মাসের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি তুলে ধরা হয়েছে। ফিউচার আর্থ, দ্য আর্থ লিগ ও ওয়ার্ল্ড ক্লাইমেট রিসার্চ প্রোগ্রাম (ডব্লিউসিআরপি) যৌথভাবে গতকাল মঙ্গলবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। এতে ৭০ জনের বেশি গবেষক কাজ করার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের ২০০ জনের বেশি বিশেষজ্ঞ মতামত দিয়েছেন।

বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য প্রতিবেদনের কয়েকটি পর্যবেক্ষণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেসব ক্ষতি ইতোমধ্যে অনিবার্য হয়ে উঠেছে, সেগুলো মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যতের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সুযোগ এখনও রয়েছে। তবে সেই সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার দ্রুত বাড়ছে। গত তিন দশকে এ হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অতীতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের যে উচ্চতা বৃদ্ধি ঘটেছে, এর একটি অংশ এখন আর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশের জন্য এই প্রবণতা বিশেষ উদ্বেগের। দেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল নিচু ও ঘনবসতিপূর্ণ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার ঝুঁকি বাড়লে উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকা আরও চাপে পড়তে পারে। কৃষি, পানীয় জলের উৎস, বসতি ও অবকাঠামোর ওপরও এর প্রভাব পড়বে। তবে ভবিষ্যতে সমুদ্রপৃষ্ঠ কতটা বাড়বে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে বিশ্ব কত দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে পারে তার ওপর। প্রতিবেদনে স্থানীয় ও আঞ্চলিক ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে অভিযোজন পরিকল্পনা জোরদার করার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্রমবর্ধমান ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সহায়তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা মিঠাপানি নিয়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের অতিরিক্ত পানি ব্যবহারের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থলভাগের মিঠাপানির মজুত কমছে। দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি অঞ্চলকে এ ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গঙ্গা অববাহিকাসহ এসব এলাকায় ব্যাপক সেচের কারণে পানির ওপর চাপ ইতোমধ্যে বেড়েছে। ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এ ঝুঁকি শুধু পানীয় জলের সংকটের বিষয় নয়। কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত পানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর মধ্যে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কেও এর প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে। 

প্রতিবেদনে পানির প্রাপ্যতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, পানির ব্যবহার আরও দক্ষ করা এবং জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় মিঠাপানির সংকটকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়লে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি দ্রুত বাড়তে পারে বলে গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে। তাপমাত্রা এই সীমার ওপরে যত বেশি এবং যত দীর্ঘ সময় থাকবে, অপরিবর্তনীয় ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিও তত বাড়বে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সুযোগ কমে যাবে এবং বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড অপসারণের ওপর নির্ভরতা বাড়বে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক গড় ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১১টি বছরই রেকর্ডে সবচেয়ে উষ্ণ বছর ছিল।

পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের পরিচালক এবং প্রতিবেদনের সম্পাদকীয় বোর্ডের সদস্য জোহান রকস্ট্রম বলেন, ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করলে সম্ভাব্য অপরিবর্তনীয় জলবায়ু প্রভাবের ঝুঁকি বাড়বে। তাপমাত্রা যত বাড়বে, এসব ঝুঁকিও তত গুরুতর হবে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশে এর অর্থ হলো– বৈশ্বিক উষ্ণতা সীমিত রাখার উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজনের প্রস্তুতিও আরও বাড়াতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাবও নতুন করে ভাবার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। কার্বনের সামাজিক ব্যয় বা ‘সোশ্যাল কস্ট অব কার্বন’ এতদিন যে পরিমাণ ধরা হয়েছে, প্রকৃত ক্ষতি এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। নতুন মূল্যায়ন অনুযায়ী, কার্বন নিঃসরণের অর্থনৈতিক ক্ষতি আগের হিসাবের চেয়ে চার গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে। এর অর্থ হলো, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের প্রকৃত খরচ শুধু জ্বালানি কেনা বা বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি হবে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু পরিবর্তনে তুলনামূলক কম অবদান রাখা অথচ বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশের জন্য এই হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির একটি বড় অংশ মোকাবিলার ব্যয় বহন করতে হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগ বা ক্ষতি কতটা বেড়েছে, তা শনাক্ত করার বিজ্ঞানও দ্রুত এগোচ্ছে। ‘ক্লাইমেট অ্যাট্রিবিউশন সায়েন্স’ নামে পরিচিত এই গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এখন নির্দিষ্ট কোনো জলবায়ু প্রভাবের সঙ্গে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের সম্পর্ক আরও নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করতে পারছেন। এর ফলে জলবায়ু মামলা, করপোরেট দায়বদ্ধতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষয়ক্ষতির জন্য অর্থায়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। অর্থাৎ, জলবায়ু পরিবর্তন যে ঘটছে, সেটি প্রমাণের পর্যায় থেকে বিজ্ঞান আরও এক ধাপ এগিয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো ক্ষতির পেছনে কার বা কোন দেশের নিঃসরণের অবদান কতটা, তা নির্ধারণের সক্ষমতাও বাড়ছে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এর গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির দায় ও অর্থায়নের প্রশ্নে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর জরুরি হলেও এই পরিবর্তন সব দেশে একই গতিতে হবে না বলে সতর্ক করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক বিভাজন কোনো কোনো দেশে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর দ্রুত করতে পারে। আবার অন্য দেশগুলোতে জ্বালানি নিরাপত্তার চিন্তা থেকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে। আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি করে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়ছে বাংলাদেশে। বিপরীতে বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুৎসহ দেশীয় ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির উৎস বাড়ানো জ্বালানি নিরাপত্তার বিকল্প পথ তৈরি করতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজমের মতো ব্যবস্থা উপযুক্ত আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা ছাড়া উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর বাড়তি ব্যয় চাপাতে পারে। বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে উৎপাদনব্যবস্থা আধুনিক করা শুধু জলবায়ু মোকাবিলার বিষয় নয়; ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সঙ্গেও তা যুক্ত হতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থায়নের প্রয়োজনও বাড়ছে। প্রতিবেদনে ২০৩৫ সালের মধ্যে বছরে অন্তত ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পূর্বানুমানযোগ্য সরকারি অর্থায়ন, অনুদান এবং স্বল্প সুদের অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে থাকায় ‘ফান্ড ফর রেসপন্ডিং টু লস অ্যান্ড ড্যামেজ’-এ উল্লেখযোগ্য নতুন অর্থ দেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে উপকূলীয় সুরক্ষা, কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, নগর অবকাঠামো ও দুর্যোগ প্রস্তুতিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন।

প্রতিবেদনের মূল বার্তা হলো– জলবায়ু পরিবর্তনের সব ক্ষতি এখনও অনিবার্য হয়ে যায়নি। ভবিষ্যতের অনেক ক্ষতি কমানো সম্ভব। তবে সেজন্য দ্রুত নিঃসরণ কমানো, কার্যকর অভিযোজন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তরের দিকে যেতে হবে।
গবেষকদের মতে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ এখনও আছে। তবে সেই সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। এখনকার সিদ্ধান্তই অনেকাংশে নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের অতিরিক্ত বোঝা কতটা বাড়বে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে কারা।

সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের পরিচালক গোলাম রব্বানী বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, দেশের কিছু এলাকায় তাপপ্রবাহ ও খরার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আবার অল্প সময়ের মধ্যে অতি ভারী বৃষ্টিও হতে পারে, যা আকস্মিক বন্যার কারণ হতে পারে।
ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক ও বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রাজিব কুমার সাহা বলেন, দীর্ঘ শুষ্ক সময় ও নদীর প্রবাহ কমে গেলে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়বে। এতে আমন ধানসহ কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি কয়েক মাস পর খাদ্য সংকটের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুন

×