ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

তথ্যপ্রযুক্তি

নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করছে পুলিশের চক্র

নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করছে পুলিশের চক্র
×
×

 সাহাদাত হোসেন পরশ

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪৬ | আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল সিমের অবস্থান, কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), এসএমএস, পাসপোর্টসহ নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করছে পুলিশ সদস্যদের একটি চক্র। সরকারি ইমেইল ব্যবহার করে ভুয়া মামলা ও জিডির তথ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের সিডিআর নিয়েছেন তারা। 

এ ধরনের অপরাধে সংশ্লিষ্ট চার পুলিশ সদস্যকে সম্প্রতি গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা নাগরিকের গোপনীয় এসব তথ্য বাইরের বিভিন্ন গ্রুপের কাছে বিক্রি করতেন। তাদের আইনের আওতায় আনা হলেও বিষয়টি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আসেনি। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। 

সূত্রটি জানিয়েছে, পুলিশের মধ্যে যারা শনাক্ত হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে গত ২৯ সেপ্টেম্বর দণ্ডবিধির তিনটি পৃথক ধারা ও অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। তাদের বিরুদ্ধে তথ্য পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন– তুরাগ থানার কনস্টেবল জিহাদ মিয়া, ডেমরা থানার সাইমুম হোসেন রাশেদ ও মাসুম মিয়া এবং ওয়ারী থানার নিজাম উদ্দীন। 

রমনা থানার মামলার সূত্র ধরে এই ঘটনায় আরও কারা কীভাবে জড়িত আছেন, এর তদন্ত শুরু হয়েছে। এখন মামলাটির তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার ও অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। 

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা সরকারি কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও প্রতারণার মাধ্যমে সিডিআর সংগ্রহ করে সামাজিক মাধ্যমে বিক্রি করে বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন। আইনগত অধিকারপ্রাপ্ত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অন্যের কাছে তুলে দিয়েছেন। বেআইনিভাবে নাগরিকের মোবাইল সিম, কললিস্ট, সিডিআর, মোবাইল ফোনের সর্বশেষ অবস্থান, এনআইডিসহ নানা তথ্য সংগ্রহ করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন। 

মামলার এজাহারে বলা হয়, ১ সেপ্টেম্বর তুরাগ থানার ওসির সরকারি ইমেইল নম্বর থেকে ১১টি মোবাইল নম্বরের জন্য তিন মাসের সিডিআর ডিবির কাছে চেয়ে একটি মেইল পাঠানো হয়েছে। ওই আবেদনে একটি তুরাগ থানায় করা ১৩ জুলাইয়ের একটি সাধারণ ডায়েরির (জিডি) কথা উল্লেখ করা হয়। 

অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা ও ইমেইল প্রেরক হিসেবে এএসআই শাহীনুল কবিরের নাম বলা হয়। একই দিনে গ্রামীণফোনের চারটি মোবাইল নম্বরের সিডিআর সংগ্রহ করে ডিবি তা তুরাগ থানায় পাঠায়। পরে অনুসন্ধানে দেখা যায়, তুরাগ থানার কনস্টেবল জিহাদ মিয়া যে জিডির কথা উল্লেখ করে ১১টি মোবাইল নম্বরের সিডিআর চেয়েছেন, সেই ধরনের কোনো জিডি ওই থানায় সেই তারিখে হয়নি। ভুয়া জিডির সূত্র এবং এএসআই শাহীনুলের নাম ব্যবহার করে সিডিআর সংগ্রহ করে তা বিক্রি করে দেন কনস্টেবল জিহাদ মিয়া। 

এ ছাড়া ২০১৬ সালের ২৮ মে ডেমরা থানার ওসির সরকারি ইমেইল ব্যবহার করে একটি মামলার সূত্র দিয়ে চারটি মোবাইল নম্বরের সিডিআর চেয়ে ইমেইল করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ইমেইলের প্রেরক হিসেব এসআই শাহ আলমের নাম ব্যবহার করা হয়। পরে বেরিয়ে আসে, ওই তারিখে ডেমরা থানায় এই ধরনের কোনো মামলা হয়নি। এসআই শাহ আলম সিডিআরের কোনো তথ্য চাননি। মূলত কনস্টেবল সাইমুম হোসেন ও মাসুম মিয়া ভুয়া মামলা ও তদন্ত কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে সিডিআর সংগ্রহ করেন। 

জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪০৯ ও ১০৯ ধারা এবং সরকারি গোপন আইনে মামলা হয়েছে। ৪২০ ধারা হলো, কোনো ব্যক্তি যদি অন্য কোনো ব্যক্তির সঙ্গে অসৎ উদ্দেশ্যে প্রতারণা করে। ৪০৯ ধারা হলো, সরকারি কর্মচারী বা ব্যাংকার দ্বারা অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ। ১০৯ ধারা হলো, অপরাধে প্ররোচনা বা সহায়তা দেওয়া। 

রমনা থানার ওসি ইয়াছিন মিয়া সমকালকে বলেন, সম্প্রতি ডিবির সাইবার ক্রাইম বিভাগ থেকে একটি মামলা হয়েছে। সেটির তদন্তও করছেন তারা। সেই মামলায় অভিযুক্তদের ব্যাপারে তদন্ত সংস্থা বলতে পারবে। 

গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগের এক কর্মকর্তা সমকালকে জানান, এ ধরনের একটি মামলার তদন্ত তারা করছেন। পুরো চক্রকে তারা বের করার চেষ্টা করছেন। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যারা যেভাবে সংশ্লিষ্ট, তাদের সবাইকে আইনে আওতায় আনতে চান তারা। পুরো চক্রকে শনাক্ত করার পর আনুষ্ঠানিকভাবে তারা বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানানোর কথা ভাবছেন।

তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব সম্প্রতি তাদের অনুসন্ধানে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রিকারী ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইটের খোঁজ পায়। পাশাপাশি শুধু ফেসবুকে এক মাসে ৬০০টির বেশি এ সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন পায়। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেশ কিছু দিন ধরে অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে সাধারণ নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য কেনাবেচা চলছে। টাকা দিলেই ওই চক্রের কাছ থেকে সিডিআর, পাসপোর্টের তথ্য, রেডিও লোকেশন, আইএমইআই সার্চ তথ্য, সিমের মালিকানা, মোবাইল ব্যাংকিং সংক্রান্ত তথ্য এবং লেনদেনের বিবরণী পাওয়া যায়। 

একটি সূত্র বলছে, মামলা বা তদন্ত-সংক্রান্ত যে কোনো কাজের প্রয়োজনে মোবাইল ফোন অপারেটরের কাছ থেকে নাগরিকের মোবাইল ফোন ব্যবহার-সংক্রান্ত তথ্য নিতে পারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অনেক মামলার ক্লু উদ্ঘাটনে সন্দেহভাজনদের সিডিআর পর্যবেক্ষণ করে দেখা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক কর্মকর্তা তদন্তের প্রয়োজনে মোবাইল ফোন অপারেটরের সঙ্গে তথ্য চেয়ে যে ইমেইল বা চিঠি আদান-প্রদান করেন সেটি অধস্তন সদস্যরা করে থাকেন। যারা নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য টাকার বিনিময়ে বেহাত করেছেন তারা কীভাবে সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে অনুসন্ধান করছেন। 

গত ১৩ সেপ্টেম্বর স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-২ এর পক্ষ থেকে নাগরিকের তথ্য কেনাবেচায় জড়িতদের একটি চক্রের ব্যাপার সামনে আনা হয়। তখন র‍্যাব পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানায়। তারা হলেন­­­ আব্দুস সালাম সরকার, সুব্রত চন্দ্র পাল, ইসমাইল হোসেন সোহাগ, এসএম নাফি ও মো. মেহেদী হাসান। র‍্যাব জানিয়েছিল, তখন পর্যন্ত ওই ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কারও যোগসাজশ তারা পাননি। এ ঘটনায় ৫টি মামলা করা হয়। 

এসআরবির অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান তখন বলেছিলেন, সরকারি সার্ভার থেকে কারা অর্থের বিনিময়ে তথ্য ফাঁস করেছে, তদন্তের স্বার্থে তা প্রকাশ করা যাচ্ছে না। তবে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে একজন নির্বাচন কমিশনে চুক্তিভিত্তিক কাজ করতেন। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি এসব কাজ করে থাকতে পারেন।

এসআরবি জানায়, অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রাহক সংগ্রহ করা হতো। এরপর নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হতো নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য। ডার্কওয়েবে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির বিষয়টি জানার পর এসব তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ শুরু করে র‍্যাব। প্রাথমিক পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় বিভিন্ন লিংক ও ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে কারা এবং কীভাবে নাগরিকদের তথ্য অনলাইনে বিক্রি করছে, তা শনাক্ত করা হয়। 

গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়, আব্দুস সালাম সরকার নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে বিক্রির উদ্দেশ্যে ‘ই-সেবা২৪ডটটপ’ নামে একটি এনক্রিপ্টেড ওয়েবসাইট তৈরি করেন। সেখানে অর্ডার দিলে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো। আব্দুস সালাম সরকার ও তার পরিচিত কিছু ব্যক্তি ‘ই-সেবা২৪ডটটপ’ ওয়েব পেজ এবং বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে মোবাইল সিমের সর্বশেষ কলের লোকেশন, রেডিও লোকেশন, আইএমইআই সার্চ তথ্য, কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), সিমের মালিকানা-সংক্রান্ত তথ্য, মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশ ও নগদ রেজিস্ট্রেশন-সংক্রান্ত তথ্য এবং লেনদেনের বিবরণী বিক্রি করতেন।

এসআরবি জানায়, চলতি বছরের এপ্রিল মাসেই ওয়েবসাইটটি তৈরি করা হয়। সালাম নিজেই ওয়েবসাইটটির অ্যাডমিন। তিনি ২০১৮ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন অফিসে অস্থায়ী ভিত্তিতে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত ছিলেন।

অন্যদিকে গ্রেপ্তার সুব্রত, ইসমাইল, নাফি ও মেহেদী ফেসবুক মার্কেটপ্লেস ও বিভিন্ন ফেসবুক পেজে বিজ্ঞাপন দিয়ে এবং হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে অর্ডার সংগ্রহ করতেন। এরপর নাগরিকদের গোপনীয় তথ্য বিক্রি করতেন তারা। 

গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যোগাযোগ করা হলে এসআরবি-২ এর অধিনায়ক ও অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান সমকালকে বলেন, নাগরিকের তথ্য বিক্রির সঙ্গে আরও কারা কীভাবে যুক্ত– তা বের করতে আমরা কাজ করছি। সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে আমরা আগের চেয়ে তৎপর। 

দেশের চারটি মোবাইল অপারেটরে ১৯ কোটির কিছু বেশি গ্রাহক রয়েছেন। সর্বশেষ ২০২২ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনশুমারি ও গৃহগণনার তথ্য বলছে, দেশে পাঁচ বছরের বেশি বয়সীদের ৫৬ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। এই ফোনে সবার কল ও খুদেবার্তার তথ্য সংরক্ষণ করে মোবাইল অপারেটরগুলো। আইনগত বাধ্যবাধকতার মধ্য দিয়ে তারা এটি করছে। সিডিআরে এসব তথ্য সংরক্ষণ থাকে। 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থাসহ ১২টি সংস্থা মোবাইল অপারেটরদের তথ্যভান্ডার ব্যবহারের সুযোগ পায়। তবে সিডিআরে হোয়াটসঅ্যাপ, সিগন্যাল, টেলিগ্রামসহ মোবাইল ফোন অ্যাপের তথ্য পাওয়া যায় না। 

 

আরও পড়ুন

×