কাক হারিয়েছে, মায়া হারায়নি বাবুলের
ছবি: রিজভী আহমেদ
দ্রোহী তারা
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ১৯:০২ | আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০১:৪৯
ভোরে ঢাকার আকাশে এখন আর আগের মতো কাকের ডাক শোনা যায় না। ইট-কাঠের এই শহরে গাছপালা কমেছে, বেড়েছে বহুতল ভবন ও যানবাহন। বাতাসেও মিশেছে নানা দূষণ। শহরের অলিগলি ও খোলা জায়গায় একসময় দল বেঁধে দেখা যেত যে কাক, সেই পরিচিত পাখিও এখন আগের তুলনায় কম চোখে পড়ে। অথচ এই অবহেলিত পাখিটিকেই নিজের মতো করে আপন করে নিয়েছিলেন গুলিস্তানের শহীদ মতিউর রহমান পার্কের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
এ.আর. বাবুল ব্যাপারী ভোলার মানুষ। থাকেন কামরাঙ্গীরচরে। নিউ মার্কেটে দোকান করার পর করোনা-পরবর্তী সময়ে গুলিস্তানের শহীদ মতিউর রহমান পার্কে একটি মনোহারি দোকান দেন। দোকান চালাতে চালাতেই কাকের প্রতি তার আলাদা এক ধরনের টান তৈরি হয়। অন্যরা যেখানে কাক তাড়িয়ে দেন, সেখানে বাবুল খুঁজে পেয়েছেন এই পাখির প্রতি মায়া।
বাবুল বলেন, ‘কাক তো কেউ বশে আনতে পারে না, সবাই অবহেলা করে। তাই ভাবলাম, একটু ব্যতিক্রম কিছু করি। তাছাড়া পাখিটা আমার মনের ভেতর এক অদ্ভুত মায়া তৈরি করেছিল।’
প্রায় দেড় বছর আগে পার্ক থেকে আহত একটি বড় জাতের দাঁড়কাক উদ্ধার করেছিলেন বাবুল। পাখিটির নাম দিয়েছিলেন ‘কাকন’। একটি বড় কাগজের বাক্সে রেখে শুরু করেছিলেন তার পরিচর্যা। দোকানের কাজের ফাঁকে কাকনের দেখাশোনা করতেন। নিজের মতো করে খাবার দিতেন, যত্ন নিতেন। কিন্তু বেশি দিন টেকেনি সেই সঙ্গ।
এক রাতে ইঁদুরের আক্রমণে গুরুতর আহত হয় কাকন। বাবুল তাকে পশু হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসা করিয়েও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি পাখিটিকে। কাকনকে হারানোর ঘটনা বাবুলের মনে গভীর দাগ কাটে।
সেই স্মৃতি মনে করে বাবুল বলেন, ‘প্রথম কাকনটা যখন মারা গেল, আমি অবুঝ শিশুর মতো কেঁদেছিলাম।’
এরপর কিছুদিন কেটে যায়। কিন্তু কাকের প্রতি তার মায়া কমেনি। চলতি বছরের মার্চের দিকে পার্কেই ঝড়ের পর একটি কাকের ছানা পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। বয়স তখন আনুমানিক এক মাস। বাবুল ছানাটিকে তুলে নেন। আগের কাকটির স্মৃতি থেকেই নতুন ছানাটির নামও রাখেন ‘কাকন’।
এই কাকনই পরে বাবুলের দোকানের নিয়মিত সঙ্গী হয়ে ওঠে। দিনের বেশির ভাগ সময় সে থাকত বাবুলের সঙ্গে। নিয়ম করে তাকে গোসল করানো হতো। রাতে কাপড় দিয়ে ঢাকা খাঁচায় ঘুমাত। সাধারণ কাক যেখানে সন্ধ্যার পরপরই নিরিবিলি হয়ে যায়, কাকন সেখানে রাত ১০টা পর্যন্ত জেগে থাকত।
পার্কে বাবুলের দোকানে আসা মানুষের কাছেও কাকন পরিচিত হয়ে ওঠে। পথচারীরা তাকে দেখতে দাঁড়িয়ে যেতেন। অনেকে ছবি তুলতেন। মানুষের সঙ্গে কাকটির এমন ঘনিষ্ঠতা ছিল যে পার্কে আসা অনেকেই তাকে আলাদা করে চিনতে শুরু করেছিলেন। কাকনকে অবশ্য কামরাঙ্গীরচরের বাসায় নিয়ে যেতে পারেননি বাবুল। পরিবারের পক্ষ থেকে আপত্তি ছিল। ফলে পার্কের দোকানই হয়ে ওঠে কাকনের স্থায়ী ঠিকানা। সেখানেই বাবুলের সঙ্গে তার দিন কাটত।
কিন্তু সেই সম্পর্কও একসময় হঠাৎ থেমে যায়। মাস তিনেক আগে জরুরি একটি কাজে অল্প সময়ের জন্য দোকান থেকে বাইরে গিয়েছিলেন বাবুল। ফিরে এসে দেখেন, কাকন নেই। অনেক খোঁজ করেও আর তাকে পাওয়া যায়নি।
কাকনকে কেউ নিয়ে গেছে কি না, নাকি সুযোগ পেয়ে নিজেই উড়ে গেছে তা জানেন না বাবুল। পার্কে আসা অনেক মানুষও কাকনকে খুঁজেছেন। কেউ কেউ এখনো বাবুলের দোকানে এসে জানতে চান, ‘ভাই, কাকটা কোথায়?’ বাবুলের উত্তর, ‘হারিয়ে গেছে।’
কাকন হারিয়ে যাওয়ার পরও কাকের প্রতি বাবুলের যত্ন থামেনি। প্রতিদিন দুপুরে নিজের খাবার থেকে কিছুটা আলাদা করে রাখেন তিনি। পার্কের পাশের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সেই খাবার রেখে দেন। সেখানে কিছুক্ষণ পর জড়ো হয় চড়ুই, শালিকসহ নানা পাখি। আসে অনেক কাকও। তবে তাদের মধ্যে কাকন নেই।
তবু কোনো আহত পাখি পার্কে পড়ে আছে কি না, সে বিষয়ে এখনো খোঁজ রাখেন বাবুল। বিশেষ করে কাক দেখলেই তার নজর যায়।
তিনি বলেন, ‘এখন আমি খোঁজ রাখি পার্কে কোনো আহত পাখি পাওয়া যায় কি না। বিশেষ করে কাক। ওদের সবাই অবহেলা করে, কিন্তু আমার খুব পছন্দের পাখি হলো কাক।’
- বিষয় :
- পাখি