১৮ মানি লন্ডারিং মামলার ১০টির তদন্ত শেষ হয়নি
ছবি-এআই দিয়ে তৈরি
বকুল আহমেদ
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:১৮ | আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে ১৮ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আলাদা ১৮টি মামলা করেছিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এসব মামলায় এক হাজার ১৯২ কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়। এ পর্যন্ত সাতটি মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) এবং একটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে আদালতে। বাকি ১০টির তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ১৬২ কোটি টাকা ফ্রিজ করা হয়েছে। ক্রোক করা হয়েছে একটি ফ্ল্যাট এবং দুই হাজার ২০ শতক জমি, যার দাম ৩৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা।
করোনা মহামারির সময় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা বেড়েছিল। ধীরে ধীরে মানুষের কাছেও এগুলো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে কিছু অসাধু ব্যক্তি প্রতারণা করেন। প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ও তাদের সহযোগীরা কেউ কেউ গ্রাহকের টাকা পাচার করেছেন বিদেশে, আবার কেউ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা সরিয়ে ব্যবহার করেছেন অন্য প্রতিষ্ঠানে।
৩০টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অন্তত ৬৮ হাজার ৭০০ অভিযোগ জমা দিয়েছেন প্রতারিত গ্রাহকরা। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত অভিযোগ জমা পড়ে ৫৮ হাজার ৭২০টি। এসব অভিযোগে গ্রাহকের দাবি করা অর্থের পরিমাণ তিন হাজার ৮৬৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা। ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর থেকে গত আগস্ট পর্যন্ত জমা পড়ে প্রায় ১০ হাজার অভিযোগ। এখনও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ছে।
অভিযোগের তালিকায় রয়েছে ই-ভ্যালি, আলিশা মার্ট, দালাল প্লাস, ই-অরেঞ্জ, কিউকম, ধামাকা শপিং, আকাশনীল, এত কিছু ডটকম, আনন্দের বাজার, শ্রেষ্ঠ ডটকমসহ ৩০টি প্রতিষ্ঠান।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, নতুন করে যে ১০ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে, এর মধ্যে আগে অভিযোগ করেছেন এমন কিছু ব্যক্তিও রয়েছেন। এগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
গত ১২ সেপ্টেম্বর অনলাইনে ভোক্তা অধিদপ্তরে অভিযোগ জমা দেন নরসিংদীর আবিদুর রহমান ও ঢাকার দক্ষিণখান এলাকার মাহাদী হাসান নামে দুই গ্রাহক। তাদের একজন অভিযোগে উল্লেখ করেন, ২০২১ সালের ১৫ মে ই-ভ্যালির একটি অফারের মাধ্যমে ‘আর ওয়ান ফাইভ ভি থ্রি’ মোটরসাইকেল অর্ডার করে দুই লাখ ৯৯ হাজার ৯০০ টাকা পরিশোধ করেন। পাঁচ বছরের বেশি সময় পার হলেও তিনি মোটরসাইকেলটি পাননি।
ই-কমার্সের প্রতারণার শিকার গ্রাহকরা দেশের বিভিন্ন থানায় একশর বেশি মামলা করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও জড়িতদের বিরুদ্ধে। ১৮ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে সিআইডি। মানি লন্ডারিং মামলার তদন্ত শুরু করে সংস্থাটি। এ পর্যন্ত আটটি মামলার প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।
তদন্তাধীন ১০ মামলা
বর্তমানে সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটে ১০টি মামলা তদন্তাধীন। সেগুলোর মধ্যে ই-ভ্যালি ডটকম লিমিটেডের মালিক মো. রাসেল ও তাঁর স্ত্রী শামীমা নাসরিনের বিরুদ্ধে ৩১০ কোটি ৯৯ লাখ ১৩ হাজার ৪০৭ টাকা আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে করা মামলাটিও তদন্তাধীন।
সিআইডি বলছে, ২০১৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে গ্রাহকের কাছ থেকে পণ্য বিক্রি ও ডেলিভারির জন্য অনলাইনে অর্ডারের মাধ্যমে তারা অর্থ সংগ্রহ করেন। তবে নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য সরবরাহ করেনি তারা। একই সঙ্গে বিভিন্ন মার্চেন্ট প্রতিষ্ঠান থেকে বড় অঙ্কের পণ্য ক্রয় করে মূল্য পরিশোধ না করে সেই অর্থও আত্মসাৎ করেন এই দম্পতি।
আরেকটি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ধামাকা বিভিন্ন পণ্যের লোভনীয় অফার ও ভার্চুয়াল সিগনেচার কার্ড বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে ৮০৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জসীম উদ্দিন চিশতীসহ অন্যরা মিলে ১১৬ কোটি ছয় লাখ টাকা অন্য প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসেবে স্থানান্তর করে মানি লন্ডারিং আইনে অপরাধ করেছেন। এমনটি উল্লেখ করে ২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সিআইডি বনানী থানায় মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করে। সেই তদন্ত আজও শেষ হয়নি।
সিআইডি জানায়, দালাল প্লাস ডটকমের কর্ণধাররা গাড়ি, মোটরসাইকেল, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন পণ্যের মূল্যের ওপর ৪৫ শতাংশ ছাড় ও ৩০ দিনের মধ্যে সরবরাহের কথা বলে সাত মাসে প্রায় ২০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। এর মধ্যে গ্রাহকের ৭৫ কোটি ৭২ লাখ ৯৪ হাজার টাকার পণ্য বুঝিয়ে দেয়নি তারা। ৪১ কোটি সাত লাখ ৩৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে ২০২২ সালের ১১ আগস্ট ধানমন্ডি থানায় প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান সালেহ উদ্দিন মুরাদসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করে সিআইডি।
২০২২ সালের ২৩ মার্চ সিরাজগঞ্জ শপ ডটকমের বিরুদ্ধে সদর থানায় চার কোটি ৯ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা পাচারের অভিযোগে সিআইডির করা মামলাটিরও তদন্ত শেষ হয়নি। এ ছাড়া ২০২২ সালের ২৩ মার্চ আনন্দের বাজারের বিরুদ্ধে ৩১৫ কোটি ৫৯ লাখ ৭৬ হাজার ৯০৬ টাকা, ২০২৩ সালের আগস্টে অ্যামাস বিডির বিরুদ্ধে সাত কোটি ৩৫ লাখ টাকা, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে গ্লিটার্স আরএসটি ওয়ার্ল্ডের বিরুদ্ধে আট কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২০২৩ সালের নভেম্বরে ওয়ালমার্টের বিরুদ্ধে ৩৩ লাখ ৪৩ হাজার টাকা, গত ১৬ এপ্রিল আদিয়ান মার্টের বিরুদ্ধে এক কোটি ৯ লাখ টাকা এবং ২০২৪ সালের নভেম্বরে ওএম বাজারের বিরুদ্ধে ৭২ লাখ ৭০ হাজার টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করে সিআইডি। এসব মামলারও তদন্ত শেষ করতে পারেনি সংস্থাটি।
আট মামলায় আদালতে প্রতিবেদন
সিআইডি-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, যে আটটি তদন্ত প্রতিবদেন আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও সাতটি অভিযোগপত্র।
অনুসন্ধানে রিং আইডির বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ পায় সিআইডি। পরে ২০২২ সালের ৪ আগস্ট গুলশান থানায় মানি লন্ডারিং মামলা করে তদন্ত সংস্থাটি। এক পর্যায়ে সিআইডি চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পরে সিআইডিকে পুনঃতদন্তের দায়িত্ব দেন আদালত। পুনঃতদন্ত শেষে গত ২৩ জুন চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।
২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট ই-অরেঞ্জ শপের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। গ্রাহকের ২৩২ কোটি ৪৩ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনা প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ই-অরেঞ্জের অন্যতম কর্ণধার বরখাস্ত হওয়া পুলিশ পরিদর্শক শেখ সোহেল রানাসহ ১২ জনকে অভিযুক্ত করে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। ২০২১ সালের অক্টোবরে গুলশান থানায় মামলা করেছিল সিআইডি।
এর আগে এসপিসি ওয়ার্ল্ড লিমিটেডের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ২৬ মে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। এতে এসপিসি ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আল আমিন, তাঁর স্ত্রী ও প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক সারমিন আক্তার এবং পরিচালক মো. ইসহাককে অভিযুক্ত করা হয়। তারা এক কোটি ১৭ লাখ টাকা স্থানান্তর করে আত্মসাৎ করেছেন বলে প্রাথমিক প্রমাণ পায় তদন্ত সংস্থাটি।
এ ছাড়া ২৪ টিকিট লিমিটেডের বিরুদ্ধে চার কোটি ৪৪ লাখ টাকা, আকাশনীল লিমিটেডের তিন কোটি ৫৫ লাখ টাকা, থলে ডটকমের চার কোটি ৯৪ লাখ, আলিশা মার্টের ৪২১ কোটি টাকা এবং আলিফ ওয়ার্ল্ডের ৭৮ লাখ টাকা পাচারের তথ্যপ্রমাণ পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের অতিরিক্ত ডিআইজি মুহাম্মদ বাছির উদ্দিন সমকালকে বলেন, ১০টি মামলার তদন্ত চলমান। কিছু মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে।
- বিষয় :
- তদন্ত
- মামলা
- মানি লন্ডারিং