পদোন্নতিজটে শিক্ষা ক্যাডার
সাব্বির নেওয়াজ
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১৯ | আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে লেগে আছে পদোন্নতির জট। একের পর এক নতুন বিসিএস ব্যাচ চাকরিতে যোগ দিলেও পুরোনো ব্যাচের অনেক কর্মকর্তাকে দীর্ঘকাল একই পদে থাকতে হচ্ছে। ৩৬তম থেকে ৪৪তম বিসিএসের কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ এখনও প্রভাষক পদে কর্মরত। এর মধ্যে ৩৬তম বিসিএসের কর্মকর্তাদের সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির প্রয়োজনীয় ফিডার সার্ভিস পূর্ণ হয়েছে। ২৯তম ব্যাচের কর্মকর্তারাও সহযোগী অধ্যাপক পদের ফিডার পূর্ণ করেছেন। একইভাবে ২৪তম ও ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তারাও অধ্যাপক হওয়ার অপেক্ষায়। সবমিলিয়ে বিসিএসের অন্তত ১০টি ব্যাচের সাড়ে চার হাজারের বেশি কর্মকর্তা সব যোগ্যতা অর্জন করে পদোন্নতির অপেক্ষায়।
দুই মাস আগে ৩৫তম বিসিএসের কর্মকর্তারা প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, যোগ্যতা ও ফিডার সার্ভিস পূর্ণ হওয়ার পরও নিয়মিত পদোন্নতি না হওয়ায় ক্যাডারের স্বাভাবিক ক্যারিয়ার কাঠামো ব্যাহত হচ্ছে। তাদের দাবি, বিসিএসের অন্য ক্যাডারে ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি কার্যক্রম নিয়মিত হলেও, শিক্ষা ক্যাডারে দীর্ঘ বিরতির পর একসঙ্গে বড় সংখ্যায় পদোন্নতি দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এই ক্যাডারে বিষয়ভিত্তিক পদোন্নতি দেওয়া হয়।
চার বছরে প্রশাসনে পদোন্নতি, শিক্ষায় শূন্য
ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতির পরিসংখ্যানেও একই রকম চিত্র। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে ২০২২, ২০২৩, ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে যথাক্রমে ১১৭, ২৭০, ২০১, ১৮৭০ ও ২৬৪ জন কর্মকর্তা ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি পেয়েছেন। কিন্তু বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে এর মধ্যে চার বছরে ষষ্ঠ গ্রেডে কোনো পদোন্নতি হয়নি। শুধু ২০২৫ সালে একসঙ্গে এক হাজার ৮৭০ জনকে ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
গত বছরের ২০ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এক হাজার ৮৭০ জন প্রভাষককে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়। এর আগে পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তারা আন্দোলন ও কর্মসূচি পালন করেছিলেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক পদোন্নতি দিয়ে বছরের পর বছর জমে থাকা জট কমানো গেলেও এটি নিয়মিত পদোন্নতি ব্যবস্থার বিকল্প নয়। এতে পরবর্তী ব্যাচগুলোর কর্মকর্তারাও আবার দীর্ঘ অপেক্ষায় পড়ছেন।
এক পদে আটকে একাধিক ব্যাচ
২০২৫ সালে পদোন্নতির জন্য গ্রেডেশনভুক্ত কর্মকর্তাদের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৩২তম থেকে ৩৭তম বিসিএসের মধ্যে ৩২তম ব্যাচে ৫৪, ৩৩তমে ৩৬১, ৩৪তমে ৬৩১, ৩৫তমে ৭৪০, ৩৬তমে ৪৬০ এবং ৩৭তমে ১৫৩ জন কর্মকর্তার নাম ছিল। দীর্ঘদিন প্রভাষক পদে থাকা এসব কর্মকর্তার বড় অংশ পরে পদোন্নতি পেলেও নতুন করে পরবর্তী ব্যাচগুলোর অপেক্ষার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে ৩৬তম বিসিএসের কর্মকর্তাদের সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ফিডার সার্ভিস পূর্ণ হয়েছে। ২৯তম থেকে ৩৪তম বিসিএসের কর্মকর্তাদের বড় অংশ সহকারী অধ্যাপক পদে কর্মরত। তাদের মধ্যে ২৯তম, ৩০তম ও ৩১তম বিসিএসের কর্মকর্তাদের সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ফিডার সার্ভিসও পূর্ণ হয়েছে।
এরও ওপরে ২৪তম থেকে ২৮তম বিসিএসের কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ সহযোগী অধ্যাপক পদে রয়েছেন। ২৪তম ও ২৫তম বিসিএসের কর্মকর্তারা অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ফিডার সার্ভিস পূর্ণ করেছেন। ফলে নিচের স্তরের পদোন্নতি বিলম্বের প্রভাব ধাপে ধাপে ওপরের স্তরেও পড়ছে। গত বছরের ১১ ডিসেম্বর শিক্ষা ক্যাডারে দুই হাজার ৭০৬ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এর মধ্যে এক হাজার ৭১১ জন সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক এবং ৯৯৫ জন সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান।
পদ আছে, তবু পদোন্নতি নেই
শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই পদসংকট ও পদ সৃষ্টির বিষয়টি সামনে আসছে। ২০২৫ সালের ডিপিসির কার্যক্রমের সময় প্রকাশিত তথ্যে সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ে চার হাজার ৩৮৯টি পদের বিপরীতে মূল পদে দুই হাজার ৭৭৯ এবং ইনসিটু পদে এক হাজার ২৫১ জন কর্মকর্তার তথ্য পাওয়া যায়। বিষয়ভিত্তিক ও সহযোগী অধ্যাপক পর্যায়েও শূন্যপদের কথা বলা হয়। তবে কর্মকর্তাদের বক্তব্য, শুধু পদসংখ্যার সংকট নয়; পদ সৃজন, আত্তীকৃত কলেজের শিক্ষক-কর্মকর্তা, বিষয়ভিত্তিক পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতাও জটের কারণ।
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির নেতারা সমকালকে বলেন, শিক্ষা ক্যাডারে বিভিন্ন স্তরে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করে প্রায় সাড়ে চার হাজার কর্মকর্তা অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের কারও কারও পদোন্নতি হলেও তাতে সরকারের অতিরিক্ত আর্থিক সংশ্লেষ নেই। পদ সংকটের কারণে তাদের পদোন্নতি দেওয়া যাচ্ছে না। এ জন্য নতুন পদ সৃষ্টির দাবি জানানো হচ্ছে।
১২ থেকে ১৪ বছর একই পদে
সরকারি কলেজের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের অভিযোগ, শিক্ষা ক্যাডারে একই পদে ১২ থেকে ১৪ বছর চাকরি করেও অনেকে পরবর্তী পদে যেতে পারছেন না। তাদের ভাষ্য, অন্যান্য ক্যাডারে ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতির সুযোগ থাকলেও শিক্ষা ক্যাডারে বিষয়ভিত্তিক পদোন্নতি হওয়ায় জট আরও বাড়ে। ফলে কোনো কোনো কলেজে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র কর্মকর্তা পদে থেকে সিনিয়র কর্মকর্তাদের ওপর উঠে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সাবেক সভাপতি আই কে সেলিম উল্লাহ খান্দকার সমকালকে বলেন, ২৫ বছর চাকরি করেও এই ক্যাডারে অধ্যাপক হতে পারেননি–এমন ভূরিভূরি উদাহরণ রয়েছে। তাঁর মতে, এত দীর্ঘ সময় পদোন্নতির জন্য অপেক্ষা করা কর্মকর্তাদের জন্য বড় ধরনের বঞ্চনা।
তবে সংগঠনের বর্তমান সভাপতি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খান মঈনুদ্দীন আল মাহমুদ সোহেল সমকালকে বলেন, ‘বর্তমান সরকারের আমলে পদোন্নতির জট ছাড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। একাধিক উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে নিয়মিত পদোন্নতি হবে বলে আশা করি।’
২০২৪ সালে সুপারনিউমারারি উদ্যোগ
দীর্ঘদিনের জট নিরসনে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আর্থিক সংশ্লেষবিহীন পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই সময় ৯২২ জন সহযোগী অধ্যাপককে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের জন্য সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এ উদ্যোগের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় সমস্যা আবারও সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের মতে, নিয়মিত পদোন্নতির পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি করা গেলে একসঙ্গে বহু ব্যাচের কর্মকর্তাকে অপেক্ষায় রাখার পরিস্থিতি কিছুটা কাটানো সম্ভব।
সামনে নতুন চাপ
সংশ্লিষ্টরা জানান, পদোন্নতির জটে যুক্ত হচ্ছে নতুন বিসিএস ব্যাচ। ৪৫তম বিসিএসের কর্মকর্তারা এখনও কলেজে যোগদান করেননি। ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হয়েছে; তারাও এখনও যোগদান করেননি। ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের কর্মকর্তাদেরও যোগদান বাকি।
বর্তমানে শিক্ষা ক্যাডারে মোট ১৯ হাজার ৮৬৮টি পদের বিপরীতে সাড়ে ১৭ হাজার কর্মকর্তা কর্মরত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তাদের অধিকাংশ সরকারি কলেজে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অনেকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে প্রশাসনিক দায়িত্বেও রয়েছেন।
ফের ডিপিসির উদ্যোগ
পদোন্নতির জট কাটাতে চলতি বছরের জুলাইয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২৩ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সরকারি কলেজ-১ শাখা থেকে পৃথক দুটি স্মারক জারি করা হয়। একটিতে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাষকদের সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির লক্ষ্যে বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সভা আহ্বান করা হয়। অন্যটিতে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের উচ্চতর গ্রেড, বিশেষ করে চতুর্থ গ্রেড প্রাপ্যতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সভা আহ্বান করা হয়। তবে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি।
শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মূল দাবি, যোগ্যতা ও ফিডার সার্ভিস পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নিয়মিত পদোন্নতির ব্যবস্থা করা। তাদের মতে, কয়েক বছর পরপর একসঙ্গে হাজার হাজার কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার বদলে একটি নির্দিষ্ট পদোন্নতি ক্যালেন্ডার করা হলে জট তৈরি হওয়ার সুযোগ কমবে।