বুলিংয়ের শিকার কিশোরীর বিষণ্নতার ঝুঁকি বেশি
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:১০ | আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
অনলাইনে হয়রানি বা সাইবার বুলিং এখন শুধু নারীর নিরাপত্তার বিষয় নয়, এটি কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। বাংলাদেশের কিশোরীদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সাইবার বুলিংয়ের শিকার কিশোরীদের মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার (এমডিডি) বা গুরুতর বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অন্যদের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।
‘বাংলাদেশি কিশোরীদের মধ্যে সাইবার বুলিংয়ের সঙ্গে মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডারের (এমডিডি) সম্পর্ক : বাংলাদেশ কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতা জরিপ ২০১৯-২০-এর ফলাফল’ শীর্ষক গবেষণাটিতে দেশের জাতীয় প্রতিনিধিত্বশীল তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই গবেষণা ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট স্প্রিংগার নেচার লিংকে প্রকাশ হয়। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের একদল গবেষক এ গবেষণা পরিচালনা করেন।
গবেষণায় জরিপে অংশ নেওয়া চার হাজার ৯৮৪ কিশোরীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১২ শতাংশ কিশোরীর মধ্যে এমডিডির লক্ষণ পাওয়া গেছে। যারা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছে, তাদের মধ্যে এমডিডির হার ৩১ শতাংশ। পাশাপাশি, সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়ার মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এমডিডির প্রকোপও বাড়তে দেখা গেছে।
সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়নি– এমন কিশোরীদের তুলনায় ১২ মাসে যে কোনো ধরনের সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়া কিশোরীদের এমডিডিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় চার গুণ বেশি বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সাইবার বুলিংয়ের ঘটনা যত ঘন ঘন ঘটে, বিষণ্নতার ঝুঁকিও তত বাড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে আজ শনিবার বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হচ্ছে। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘জীবনের কথা শুনি, বাস্তব পরিবর্তন আনি’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মানসিক স্বাস্থ্যনীতি ও সেবা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যার অভিজ্ঞতা থাকা ব্যক্তিদের কথা শুধু শোনা নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায়ও তাদের যুক্ত করা জরুরি।
দিবসটি উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি সহমর্মিতা ও সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি তাদের যথাযথ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পরিবার ও সমাজের সহায়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা বর্তমান সরকারের জনকল্যাণমুখী স্বাস্থ্যনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। দৃশ্যত স্বাস্থ্যবান অথবা নীরোগ থাকাটাই স্বাস্থ্য নয়; বরং শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকার নামই স্বাস্থ্য। সুতরাং, কোনোভাবেই মানসিক স্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
বরিশালে সাইবার বুলিং বেশি
অঞ্চলভেদেও সাইবার বুলিংয়ের অভিজ্ঞতায় পার্থক্য পাওয়া গেছে। কিশোরীদের মধ্যে বরিশালে সাইবার বুলিংয়ের হার সবচেয়ে বেশি; ১৩ শতাংশ। এর পর রয়েছে রংপুরে ১১ শতাংশ এবং ময়মনসিংহে ১০ শতাংশ। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীতে ৮ এবং ঢাকায় ৬ শতাংশ। সবচেয়ে কম হার পাওয়া গেছে সিলেটে; ৪ শতাংশ।
সাইবার বুলিংয়ের সঙ্গে কারা জড়িত, সেখানেও বৈবাহিক অবস্থাভেদে কিছু পার্থক্য দেখা গেছে। অবিবাহিত কিশোরীদের ক্ষেত্রে বন্ধু বা সহপাঠীরা তুলনামূলকভাবে বেশি জড়িত থাকলেও বিবাহিত ও অবিবাহিত উভয় শ্রেণির ক্ষেত্রেই অপরিচিত ব্যক্তিরা সাইবার বুলিংয়ের সবচেয়ে বড় উৎস ছিলেন। এ ছাড়া বিবাহিত বা আগে বিবাহিত কিশোরীদের ৬ দশমিক ৬ শতাংশ জানিয়েছে, তারা স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের কাছ থেকেও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছে।
সাইবার স্পেসে বুলিং, হয়রানি বা অন্য কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার হলে বিষয়টি গোপন না রেখে দ্রুত সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, সাইবার সহিংসতার শিকার ব্যক্তিকে পরিবারের সদস্যদের দোষারোপ করা বা ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাইবার সংশ্লিষ্ট ইউনিটের সহায়তা নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
তাঁর মতে, সাইবার সহিংসতার কারণে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর যে প্রভাব পড়ে, তার জন্যও যথাযথ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেওয়া জরুরি। মৃদু মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে উন্নতি সম্ভব। তবে সমস্যা গুরুতর হলে প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ ও কাউন্সেলিং দুই ধরনের চিকিৎসাই লাগতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বড় ঘাটতি
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা ২০১৮-১৯ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৩ শতাংশ কিশোর-কিশোরী বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্যনীতি ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যার তুলনায় মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সংখ্যাও অত্যন্ত কম। প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে দেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন মাত্র শূন্য দশমিক ১৩ জন। অন্যান্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শূন্য দশমিক ১ জন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাদানকারী নার্স শূন্য দশমিক ৮৭ জন এবং মনোবিজ্ঞানী ও অন্যান্য পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী শূন্য দশমিক ১২ জন।
ডা. হেলাল উদ্দিন বলেন, দেশে মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৯২ শতাংশই চিকিৎসাসেবার আওতার বাইরে রয়েছেন। বর্তমানে ঢাকায় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এবং পাবনায় বিশেষায়িত মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা রয়েছে। বিভিন্ন মেডিকেল কলেজেও মানসিক রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এ ধরনের সেবা এখনও সীমিত।
দ্রুত কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ তৈরির তাগিদ
গবেষকদের মতে, কৈশোরে সামাজিক সম্পর্ক, আত্মপরিচয় এবং সহপাঠীদের গ্রহণযোগ্যতা মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ সময়ে অনলাইনে অপমান, হয়রানি কিংবা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার অভিজ্ঞতা কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
সাইবার বুলিং প্রতিরোধ ও এর মানসিক ক্ষতি কমাতে সহজলভ্য অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকরা। পাশাপাশি স্কুল এবং সামাজিক মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো এবং শিক্ষক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের মাধ্যমে দ্রুত কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।
ডা. হেলাল উদ্দিন বলেন, দেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি এ বিষয়ে প্রচলিত কুসংস্কার ও সামাজিক স্টিগমা দূর করা জরুরি। মানসিক সমস্যা দেখা দিলে তা গোপন না করে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে। দেশে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর ঘাটতি পূরণে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও নার্সদের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে দক্ষ করে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সুপারিশ
গবেষণা প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সাইবার বুলিং মোকাবিলা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্বাস্থ্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া। এ জন্য অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। সাইবার বুলিংয়ের ঝুঁকি সম্পর্কে কিশোরীদের সচেতন করা, অনলাইনে ইতিবাচক আচরণে উৎসাহিত করা এবং এর শিকার ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে কার্যকর নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
গবেষণায় উঠে আসা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাইবার বুলিংয়ের ঘটনা ঘটলে তা দ্রুত জানানো বা অভিযোগ করা। অভিযোগ জানাতে দেরি হলে সাইবার বুলিংয়ের কারণে সৃষ্ট মানসিক ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
সাইবার বুলিংয়ের লক্ষণগুলো কীভাবে শনাক্ত করতে হয়, সে বিষয়ে কিশোরী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের সচেতন করা এবং সহজে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। এতে ভুক্তভোগীরা দ্বিধা ছাড়াই সহায়তা চাইতে উৎসাহিত হবে।
এছাড়া সাইবার বুলিংয়ের শিকার ব্যক্তিদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা হলে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের মতো মানসিক সমস্যার প্রভাব কমানো সম্ভব। নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলতে নীতিনির্ধারক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বুলিংবিরোধী নীতিমালা প্রণয়ন, সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার ব্যবস্থা রাখতে হবে। পাশাপাশি, সন্তানদের অনলাইন কার্যক্রমের ওপর নজর রাখা এবং সাইবার বুলিংয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে তাদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে অভিভাবকদের উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
মগ্রিকভাবে, সাইবার বুলিং প্রতিরোধ ও এর ক্ষতিকর প্রভাব কমানোর উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া এবং অনলাইন ও বাস্তব জীবনে সহায়ক ও নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি, মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে তোলার উদ্যোগও নিতে হবে।
- বিষয় :
- কিশোরী
- হয়রানি
- সাইবার বুলিং
- নারীর নিরাপত্তা