ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

শাহজালাল বিমানবন্দরে ৮ ঘণ্টা

নজরদারি বেড়েছে, সংকট কাটেনি

সচল ট্রলি ৩৩০০, কেনা হচ্ছে আরও ৫০০টি

নজরদারি বেড়েছে, সংকট কাটেনি
×
×

ক্যানোপি এলাকায় যাত্রীদের স্বজনের অপেক্ষা। যদিও নির্ধারিত স্থান অন্যখানে -সমকাল

 ইন্দ্রজিৎ সরকার ও শহিদুল আলম

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:১২ | আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

কুয়েতের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার হুমায়ুন আহমেদ। তিন বছর পর গত বৃহস্পতিবার দেশে ফেরেন তিনি। সকাল সাড়ে ৯টায় ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। এর পর আগমনী-২ নম্বর টার্মিনালের ক্যানোপি কার পার্কিং এলাকায় তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার পর মালপত্র বুঝে পেতে দেরি হয়নি। আধাঘণ্টার মধ্যেই অক্ষত অবস্থায় সব লাগেজ পেয়েছেন। ট্রলি পেতেও ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি।

শুধু এই প্রবাসীই নন, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে আসা যাত্রীদের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে সমকাল। তাদের প্রায় সবাই জানিয়েছেন, ট্রলি বা লাগেজ পেতে সমস্যা পোহাতে হয়নি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষাও করতে হয়নি। তবে ‘পিক আওয়ারে’ ট্রলির সংকট এখনও কাটেনি। 

এর আগে ১ অক্টোবর শাহজালালে ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে। সেদিন যাত্রীর চাপ থাকায় লাগেজ ও ট্রলি পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তখন বিশৃঙ্খলা, হট্টগোল ও হুমকি-ধমকির ঘটনা ঘটে। পরে এ-সংক্রান্ত মামলায় বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও বর্তমানে জামায়াত নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান রঞ্জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই ঘটনার পর ট্রলি ও লাগেজ ব্যবস্থাপনায় আরও মনোযোগ দেয় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। ফলে গত এক সপ্তাহে যাত্রীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসে। তবে যাত্রীর সংখ্যার তুলনায় ট্রলি অপ্রতুল তা স্বীকার করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ফলে যাত্রীর চাপ বেড়ে গেলে ট্রলি পেতে অপেক্ষায় থাকতে হয়। 

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে টার্মিনাল-২-এর ক্যানোপি এলাকায় লাল মিয়া নামে এক যাত্রীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি ওমরাহ করে দেশে ফিরেছেন। তিনি জানালেন, লাগেজ পেতে অতিরিক্ত সময় লাগেনি। জমজমের পানিও ঠিকমতো পেয়েছেন। সম্প্রতি ফেসবুকে দেখেছিলেন, শাহজালালে লাগেজ পেতে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। কিন্তু তিনি তেমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি। 

আবুধাবিতে চাকরি করেন কুমিল্লার রবিউল হোসাইন সুমন। দুপুর পৌনে ১২টায় তিনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে এসে নামেন। আগমনী কনকোর্স হলে তিনি জানান, লাগেজ পেতে আধাঘণ্টার মতো সময় লেগেছে। সব মিলিয়ে তাঁর মনে হয়েছে, সেবার মান আগের চেয়ে ভালো।

প্রায় একই সময়ে চীন থেকে আসেন ব্যবসায়ী রহমত আলী। কনকোর্স হলে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ট্রলি সংকট অন্য দেশের বিমানবন্দরেও হয়। তবে সেখানে সবাই শান্তভাবে অপেক্ষা করে। এখানে (দেশে) আমরা কেন যেন অধৈর্য হয়ে যাই। 

সৌদি আরবের তায়েফ শহরে কাজ করেন আবেদ হোসেন। একই দিন দুপুর আড়াইটায় তাঁর বিমান শাহজালালে এসে নামে। গ্রামের বাড়ি ফেনীর উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে টার্মিনাল-২ এলাকায় তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, এখন বিমানবন্দরে যেমন পরিস্থিতি দেখছেন, তেমন থাকলে কারোই অভিযোগ থাকবে না। 
একই সময়ে সৌদি থেকে আসেন মাদারীপুরের শিবচরের হায়দার মাদবর। তাঁর ভাষ্য, প্রবাসী শ্রমিকদের অনেকে হয়তো বিমানবন্দরের নিয়মকানুন ঠিকঠাক জানেন না। সে কারণে বা অন্য কোনো কারণে যেন তাদের হেয় প্রতিপন্ন না করা হয়।    

বিকেল সাড়ে ৫টায় সৌদি আরব থেকে আসেন শিবচরের ফারুক হোসেন। টার্মিনালের বাইরের অংশে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, অনেক সময় বিদেশের বিমানবন্দরে নিরাপত্তাজনিত কারণে ব্যাগ খুলে দেখে। দেশে আসার পর সেটা দেখে যাত্রী ভাবেন, এখানেই লাগেজ খোলা হয়েছে।

এদিকে টার্মিনালের বাইরের অংশে যাত্রীর স্বজনের ভিড় দেখা যায় প্রায় সব সময়। তাদের অনেকে স্টিলের রেলিংয়ের ওপর বসেছিলেন। যদিও স্বজনের অপেক্ষার স্থান আরেকটু দূরে। তবে সেখানে পর্যাপ্ত চেয়ার নেই। পরিবেশও ভালো নয়। আবার টার্মিনালের সামনে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকার নিয়ম নেই। কিন্তু যাত্রী ওঠানামার নামে গাড়িগুলোকে দীর্ঘ সময় সেখানে থাকতে দেখা যায়।

শাটল বাসে যাত্রী নেই
বিমানবন্দর থেকে যাত্রীদের কাছাকাছি গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ফ্রি শাটল বাস সার্ভিস চালু করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দুটি বাস ২৪ ঘণ্টাই টার্মিনালের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। তবে সেখানে যাত্রীরা খুব কমই যান। 

কথা বলে জানা গেল, বেশির ভাগ যাত্রী এই সেবা সম্পর্কে জানেন না। আর বাসের রুটটিও যাত্রীদের জন্য সুবিধাজনক নয়। বাসগুলো একদিকে জসিম উদ্‌দীন, অন্যদিকে কাওলা পর্যন্ত যায়। এই দুটি স্থানে নেমে বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীদের কোনো সুবিধা হয় না। অথচ এর পেছনে মাসে ৯ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে।

সচল ৩৩০০ ট্রলি
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, শাহজালালে তিন হাজার ৯৯০টি ট্রলি থাকলেও সচল আছে তিন হাজার ৩০০টি। বেবিচকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মুহাম্মাদ কাউছার মাহমুদ বলেন, পিক আওয়ারে যাত্রীর চাপের তুলনায় ট্রলির সংখ্যা কিছুটা অপ্রতুল। তখন ট্রলি পেতে মাঝেমধ্যে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। তবে এ নিয়ে গত এক বছরে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। যাত্রী ভোগান্তি কমাতে আরও ৫০০ ট্রলি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ট্রলি ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণে কোনো প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা এখনও নেই।

বসছে এআই ক্যামেরা
বিমানবন্দরে লাগেজ কেটে মালপত্র চুরি, লাগেজ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মসহ অন্যান্য নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুই ডজনের বেশি এআই ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) অতিরিক্ত সচিব এস এম লাবলুর রহমান বলেন, ডিজিটাল নজরদারি বাড়াতে বিমানবন্দরে এআই ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে। আগামী বৃহস্পতিবার থেকে ক্যামেরা চালু হবে। আগমনী হলে আটটি কনভেয়ার বেল্ট রয়েছে। প্রতি বেল্টের দুই পাশে বসানো হচ্ছে দুটি করে মোট ১৬টি মনিটর। ৫৬ ইঞ্চির এসব মনিটরে যাত্রীরা লাগেজ সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়া দেখতে পারবেন। 

 

আরও পড়ুন

×