ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

শরতের বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় সাহিত্যের আলো

ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ২০২৪-২০২৫

শরতের বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় সাহিত্যের আলো
×
×

রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে অতিথিদের সঙ্গে ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্তরা- সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:১৯ | আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ২১:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

ছুটির দিনের সন্ধ্যা। বাইরে আশ্বিনের বৃষ্টি। নগর জীবনের ব্যস্ততা পেরিয়ে এক মঞ্চে জড়ো হয়েছেন কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা। কারও হাতে বই, কারও চোখে প্রিয় লেখককে একনজর দেখার আগ্রহ। মঞ্চে কখনও নৃত্যের ছন্দ, কখনও গানের সুর। আর সবকিছুর কেন্দ্রে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা।

গতকাল শুক্রবারের এই সন্ধ্যায় ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার-২০২৪ ও ২০২৫ তুলে দেওয়া হয় কবি, কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও সাহিত্যজগতের আট বিশিষ্টজনের হাতে। দুই বছরের আটটি সম্মাননা ঘিরে এক মঞ্চে মিলেছিলেন বিশিষ্টজনরা। শুধু পুরস্কার প্রদানই আয়োজনের একমাত্র অনুষঙ্গ ছিল না। বক্তাদের কথায় উঠে এসেছে সাহিত্যচর্চার সংকট, লেখকদের স্বীকৃতি, প্রকাশকদের পাশে দাঁড়ানো এবং শিল্প-সাহিত্যে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তা।

রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমে পূজা সেনগুপ্তের পরিচালনায় তুরঙ্গমীর নৃত্যনাট্য ‘শরৎ দর্পণ’ দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। ‘দেখো দেখো শুকতারা, আঁখি মেলি চায়’ গানের সুরে মঞ্চে ছড়িয়ে পড়ে শরতের আবহ। পরে প্রিয়াঙ্কা সাহা পাঁচটি গান পরিবেশন করেন। 

সমকালের উপসম্পাদক মাহবুব আজীজের উপস্থাপনায় পর্দায় ব্র্যাক ব্যাংক-সমকালের ১৫ বছরের সাহিত্যযাত্রা তুলে ধরেন ব্র্যাক ব্যাংকের চিফ কমিউনিকেশন অফিসার ইকরামুল কবির। এরপর চলে পুরস্কার প্রদান পর্ব। 

তরুণ সাহিত্য বিভাগে ‘জলমাকড়ের নৌকাবাইচ’ গ্রন্থের জন্য ২০২৪ সালের পুরস্কার পেয়েছেন নিজাম বিশ্বাস। প্রবন্ধ, আত্মজীবনী ও অনুবাদ বিভাগে প্রবন্ধ সংকলন ‘বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ’-এর জন্য পুরস্কার পেয়েছেন অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী। আনোয়ারা সৈয়দ হক পুরস্কার পেয়েছেন কবিতা ও কথাসাহিত্য বিভাগে, ‘সময় বহিয়া গেল’ উপন্যাসের জন্য। আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। 

একইভাবে তরুণ সাহিত্য বিভাগে ২০২৫ সালের জন্য পুরস্কার পেয়েছেন ‘সায়ানাইড ফুল’ উপন্যাসের জন্য মাহবুব ময়ূখ রিশাদ। তাঁর পক্ষে তাঁর স্ত্রী পুরস্কার গ্রহণ করেন। প্রবন্ধ, আত্মজীবনী ও অনুবাদ বিভাগে ‘পালকের চিহ্নগুলো (আত্মজৈবনিক স্মৃতিকথা)’ গ্রন্থের জন্য নাসরীন জাহান এবং কবিতা ও কথাসাহিত্যে ‘মানচিত্র’ গ্রন্থের জন্য শাহীন আখতার পুরস্কার পেয়েছেন। আর আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন।

শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে পুরস্কার গ্রহণ করেন কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহান। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে নিজের অসুস্থতা, মৃত্যু-ভাবনা ও বেঁচে থাকার প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরলেন। তিনি বলেন, “গত বছর সমকাল সাহিত্য পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের দিন বিকেলেই জানতে পারি, আমার ক্যান্সার হয়েছে। সেদিন অনুষ্ঠানে এলে মঞ্জুর ভাই বলেছিলেন, ‘তুমি অনেক দিন বাঁচবে। তোমার কিছু হবে না।’ এই একটা বছর মৃত্যু নিয়ে ভেবেছি। চিকিৎসকরা বলছেন, অপারেশন করে আমার গলব্লাডার ফেলে দিতে হবে এবং দুটি কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হবে। মৃত্যুকে অনেকটা মেনে নিয়েছিলাম। ভাবছিলাম, হয়তো আগামী বছর আর এখানে আসতে পারব না। কিন্তু হঠাৎ মনে হলো, মৃত্যু আমাদের কিছু জিজ্ঞেস করে কিনা? আমরা তো তা শুনতে পাই না। কিন্তু আমরা রাজি হয়ে যাই, তারপর চলে যাই। আমি রাজি হচ্ছি না, দেখা যাক কী হয়।”

পুরস্কারপ্রাপ্তদের জীবন ও কর্মের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এবং পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়া নিয়ে ধারণ করা ভিডিও ক্লিপ অনুষ্ঠানে বড় পর্দায় দেখানো হয়। 

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার জগতে চিন্তার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁর এই বক্তব্য যেন ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার অনুষ্ঠানের মূল সুরটিই তুলে ধরল। তাঁর মতে, সাহিত্যচর্চায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগও জরুরি। তবে সেই পৃষ্ঠপোষকতা হতে হবে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে।

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, এত জ্ঞানী-গুণী ও সংস্কৃতিমনা মানুষের সমাগমই প্রমাণ করে, ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার কতটা তাৎপর্য বহন করে। সাহিত্যচর্চা সাধারণত লাভজনক পেশা নয়। সৃজনশীলতার তাগিদেই লেখকরা কাজ করেন। তাই তাদের ন্যূনতম স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। এই পুরস্কার সেই স্বীকৃতিরই একটি উদ্যোগ। তিনি বলেন, ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কারের বিশেষত্ব হলো, এখানে পুরস্কার নির্বাচনে সংকীর্ণ বিবেচনা বা দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবকাশ নেই।

আজীবন সম্মাননা পাওয়া অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর অবদান তুলে ধরে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সারাজীবন নিজের আদর্শে অবিচল থেকেছেন সিরাজ স্যার। একই সঙ্গে সমসাময়িক সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে লিখে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সচেতন করেছেন। প্রবন্ধ, গবেষণা, অনুবাদ ও শিশুসাহিত্যসহ তাঁর কাজের পরিধি বিস্তৃত। তাঁর মতো মানুষেরা জ্ঞানমনস্ক ও সংস্কৃতিমনস্ক সমাজ গঠনে আজীবন অবদান রেখেছেন।

পূজা সেনগুপ্তের পরিচালনায় তুরঙ্গমীর নৃত্যনাট্য ‘শরৎ দর্পণ’ দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান -	সমকাল

অনুষ্ঠানে পুরস্কারপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানান টাইমস মিডিয়া লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ. কে. আজাদ। তিনি বলেন, সমাজ ও সংস্কৃতির বিকাশে শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। ব্যাংকসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগে অবদান রাখতে হবে। দেশের নানা প্রান্তে অনেক প্রতিভা ছড়িয়ে আছে, কিন্তু সুযোগের অভাবে তারা সামনে আসতে পারে না। উৎসাহ ও স্বীকৃতি পেলে এসব মানুষ আরও মূল্যবান কাজ করতে পারবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ব্র্যাক ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ফারুক মইনউদ্দীন বলেন, একসময় বেসরকারি উদ্যোগে অনেক সাহিত্য পুরস্কার চালু হলেও সেগুলোর বেশির ভাগই টেকেনি। এ ধরনের উদ্যোগ টিকিয়ে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার ও সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। পুরস্কার সাহিত্যকে বড় করে না, তবে সাহিত্যিকদের কাজের স্বীকৃতি দেওয়া সমাজ ও করপোরেট খাতের দায়িত্ব। ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার যেন কখনও বন্ধ না হয়, সেই প্রত্যাশাও করেন তিনি।

পুরস্কার নির্বাচনের প্রক্রিয়া তুলে ধরে বিচারকমণ্ডলীর সদস্য ফয়জুল লতিফ চৌধুরী বলেন, দুই বছরের পুরস্কারের জন্য মোট ৩৬টি বই মূল্যায়ন করা হয়েছে। বইয়ের ধরন অনুযায়ী মূল্যায়নের মানদণ্ডও আলাদা ছিল। ভালো বই বিচারকমণ্ডলীর কাছে পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রকাশকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। কবিতার বই তুলনামূলকভাবে কম জমা পড়েছে বলেও জানান তিনি।

ব্র্যাক ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবদুল মোমেন বলেন, ব্যাংকিং জগতে প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, আমানত ও অর্থনীতির হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মানুষ বেঁচে থাকে ভাষা, স্মৃতি, সম্পর্ক ও স্বপ্ন নিয়ে। সাহিত্য অন্য মানুষের জীবনকে বুঝতে শেখায়। লেখকের নিভৃত ও দীর্ঘ পরিশ্রমকে সম্মান জানানোই এই পুরস্কারের উদ্দেশ্য। 

অনুষ্ঠানের সভাপতি ও সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক, আমন্ত্রিত অতিথি ও আয়োজনের সঙ্গে ১৫ বছর ধরে যুক্ত ব্র্যাক ব্যাংকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি পুরস্কার পাওয়া বইগুলোর প্রকাশকদেরও অভিনন্দন জানান। 

যারা উপস্থিত ছিলেন
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুবউল্লাহ, লেখক হাসনাত আবদুল হাই, আনিসুল হক, মোহন রায়হান, মোহিত কামাল, ফরিদ কবির, মারুফ রায়হান, বিমল গুহ, শোয়েব জিবরান, ফারুক মাহমুদ, তুষার দাশ, স্বকৃত নোমান, জুনান নাশিত, আলফ্রেড খোকন, সাখাওয়াত টিপু, জাফর আহমেদ রাশেদ, সুমন্ত আসলাম, শোয়েব সর্বনাম প্রমুখ। ছিলেন প্রকৃতিবিদ ইনাম আল হক ও মৃত্যুঞ্জয় রায়।

স্কয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ, আব্দুল হক, প্রাইম ব্যাংকের চেয়ারম্যান তানজিল চৌধুরী, সায়েম কটন মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, সায়েম নিট কম্পোজিট মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ শাফকাত আহমেদ, আলোক হেলথ কেয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লোকমান হোসেন, জাপাইগো বাংলাদেশের ডা. ইখতিয়ার উদ্দীন খন্দকার, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের ভাইস চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম নিরু, পরিচালক আশরাফুল হক মুকুল, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পরিচালক (ইনফ্লুয়েন্সিং, ক্যাম্পেইন অ্যান্ড কমিউনিকেশনস) নিশাত সুলতানা প্রমুখ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। রাজনীতিবিদদের মধ্যে ছিলেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক প্রমুখ।  

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, চ্যানেল আইয়ের পরিচালক শাইখ সিরাজ, বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, আজকের পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কামরুল হাসান, এপির সাবেক প্রধান ফরিদ হোসেন, চ্যানেল ২৪-এর নির্বাহী পরিচালক জহিরুল আলম, আনন্দ আলোর সম্পাদক রেজানুর রহমান, প্রথমা প্রকাশনের প্রধান সমন্বয়ক মেরিনা ইয়াসমিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। 

আরও পড়ুন

×