এসএসসিতে অকৃতকার্য হওয়া বিষয়ে ৩ মাসের মধ্যে পরীক্ষার সুযোগ বিবেচনা করা হচ্ছে: মাহদী আমিন
বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘চ্যালেঞ্জড শিক্ষার্থী সম্মেলন-২০২৬’-এ প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন। ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:২৪
এসএসসিতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের তিন মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দিতে চায় সরকার। এমন প্রায় ৬ লাখ ৯ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় নতুন কর্মপরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন।
শনিবার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘চ্যালেঞ্জড শিক্ষার্থী সম্মেলন-২০২৬’-এ বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
গণসাক্ষরতা অভিযান ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে দেশের আট বিভাগের শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, গবেষক ও উন্নয়নকর্মীসহ দুই শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে মাহদী আমিন বলেন, পরীক্ষায় খারাপ ফলের জন্য শুধু মেধার ঘাটতিকে দায়ী করা যায় না। পারিবারিক ও আর্থিক সংকট, শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের অভাব, অসুস্থতা কিংবা নানা প্রতিকূলতাও এর কারণ হতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের ফলাফলের ভিত্তিতে বিচার না করে সমস্যার কারণ চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মতো প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতিও রাষ্ট্রের সমান দায়িত্ব রয়েছে। কারও একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া কিংবা পরীক্ষায় খারাপ ফলের কারণে তার অন্য প্রতিভা, সৃজনশীলতা ও সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায় না। শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও যোগ্যতা অনুযায়ী ভবিষ্যতের পথ তৈরি করাই সরকারের লক্ষ্য।
তিন মাসে পুনঃপরীক্ষার বিষয়টি বিবেচনায়
এসএসসিতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের এক বছর অপেক্ষা না করিয়ে তিন মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা বিশেষ করে যে বিষয়ে শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে, শুধু সেই বিষয়ে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন। বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিবেচনা করা হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের পদ্ধতি নিয়েও কথা বলেন উপদেষ্টা। তিনি জানান, শুধু নম্বরের যোগ-বিয়োগ যাচাইয়ের পরিবর্তে প্রতিটি উত্তরের গুণগত মান মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, শিক্ষার মানোন্নয়নে মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সমস্যার কার্যকর সমাধানও জরুরি।
কারিগরি প্রশিক্ষণ ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ
অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও আগ্রহ অনুযায়ী কারিগরি ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান মাহদী আমিন। যারা এ ধরনের প্রশিক্ষণে আগ্রহী, তাদের নিজ এলাকার টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। কারও ভালো ব্যবসায়িক ধারণা থাকলে তাকে প্রাথমিক পুঁজি সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ কাজে লাগাতে বিদেশি ভাষা শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাপানি, কোরীয়, চীনা কিংবা ইউরোপের কোনো দেশের ভাষা তিন থেকে ছয় মাসে শেখানোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিদেশে কাজের উপযোগী করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষার মান বাড়াতে শিক্ষকদের মূল্যায়নের তাগিদ
সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে শিক্ষকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত শিখনফল অর্জন করতে না পারলে এর পেছনের কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষার্থীকে শেখানোর দায়িত্ব শিক্ষক ও অভিভাবক উভয়ের হলেও শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, শিক্ষকরা শিক্ষাদানের লক্ষ্য নিয়েই এ পেশায় আসেন। কিন্তু নানা কারণে সব সময় যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। তাই শিক্ষকদের পেশাগত কার্যক্রম মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। শুধু পরীক্ষার ফল নয়, পাঠদানের কার্যকারিতা ও শেখার পরিবেশও বিবেচনায় নিতে হবে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্মার্টফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ববি হাজ্জাজ বলেন, ডিভাইস আসক্তি এখন বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তির ব্যবহার যেন শিক্ষার্থীদের মনোযোগ, শেখার আগ্রহ ও স্বাভাবিক বিকাশে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সে জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের নানা সুপারিশ
সম্মেলনের উন্মুক্ত আলোচনায় চা-বাগান, আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও গৃহকর্মীর সন্তানসহ বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা তাদের অভিজ্ঞতা ও সুপারিশ তুলে ধরেন। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার কারণ, এর ফলে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ এবং এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।
আলোচনায় উঠে আসা সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে—তিন মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা, অন্তত দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের কলেজে ভর্তির সুযোগ, সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে তাদের অগ্রাধিকার এবং দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার সম্প্রসারণ, বিদ্যালয়ে আফটার-স্কুল কার্যক্রম চালু এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক শিক্ষার পরিবেশ তৈরির সুপারিশ করা হয়।
এ ছাড়া বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য এসএসসির বিষয়ভিত্তিক বিকল্প ব্যবস্থা, শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, সঠিকভাবে শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি ও নজরদারি বৃদ্ধি, ডিভাইস আসক্তি কমানো এবং শিক্ষায় কমিউনিটির অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুপারিশ করেন অংশগ্রহণকারীরা।
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী। সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন গণসাক্ষরতা অভিযানের কাউন্সিলের চেয়ারপারসন ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. ইরাম মরিয়ম, প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান ডা. আরিফুর রহমান এবং প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস।
আরও বক্তব্য দেন তরুণ লেখক ও মোটিভেশনাল স্পিকার সাদাত হোসাইন এবং নিউজিল্যান্ড ডেইরির চিফ মার্কেটিং অফিসার আসিফ রউফ। সূচনা বক্তব্য দেন গণসাক্ষরতা অভিযানের উপপরিচালক তপন কুমার দাশ। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পরিচালক নিশাত সুলতানা।
- বিষয় :
- এসএসসি
- মাহদী আমিন