হজ ব্যবস্থাপনা
ন্যূনতম হজযাত্রী পায়নি ১৮৬ এজেন্সি
শূন্য নিবন্ধন ৩২ এজেন্সির
দেলওয়ার হোসেন
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
এবার হজ ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব দিচ্ছে এমন কিছু এজেন্সি, যেগুলো তাদের জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম সংখ্যক হজযাত্রীও নিবন্ধন করতে পারেনি। এ অবস্থায় লিড এজেন্সি নির্বাচন এবং হজ ব্যবস্থাপনায় তাদের সক্ষমতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
একটি লিড এজেন্সির অন্তত দুই হাজার হজযাত্রীর বাংলাদেশ ও সৌদি আরব পর্বের সেবা সমন্বয় ও নিশ্চিত করার সক্ষমতা থাকার কথা। অথচ লিড এজেন্সির তালিকায় থাকা মারহামাহ এয়ার ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরস এবার নিবন্ধন করেছে মাত্র ৩৯ জন হজযাত্রী। একই অ্যালায়েন্সের সমন্বয়কারী এজেন্সিগুলোর ৩৩টিই এর চেয়ে বেশি হজযাত্রী নিবন্ধন করেছে।
মারহামাহর মতো আরও কয়েকটি লিড এজেন্সির নিবন্ধনও নির্ধারিত কোটার ধারেকাছে নেই। মেসার্স সালসাবিল এভিয়েশন ও সোহেল অ্যান্ড ব্রাদার্স নিবন্ধন করেছে ৪৪ জন করে হজযাত্রী। কোনো কোনো লিড এজেন্সি সমন্বয়কারী এজেন্সির হজযাত্রী নিজেদের আওতায় স্থানান্তর করে কোটা পূরণের চেষ্টা করছে বলেও জানা গেছে।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজযাত্রী সংগ্রহের জন্য ২৮টি লিড এজেন্সির ন্যূনতম কোটা দুই হাজার করে। অন্যদিকে, ৬৮৪টি সমন্বয়কারী এজেন্সির ন্যূনতম কোটা ৪৪ জন। কিন্তু এই সংখ্যা পূরণ করতে পারেনি ১৮৬টি এজেন্সি। এর মধ্যে ৩২টি কোনো হজযাত্রী নিবন্ধন করেনি। ছয়টি হজ অ্যালায়েন্স দুই হাজারের কোটা পূরণ করতে পারেনি। এগুলো হলো মানাসিক কনসোর্টিয়াম-২, মানাসিক অ্যালায়েন্স, মারহাবা অ্যালায়েন্স, মাবরুর এয়ার অ্যালায়েন্স, সিকদার গ্রুপ অ্যালায়েন্স ও চট্টগ্রাম হজ অ্যালায়েন্স। এসব এজেন্সি ও অ্যালায়েন্সের হজযাত্রীদের ব্যবস্থাপনা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একটি অ্যালায়েন্সের হজযাত্রীদের ভিসা, আবাসন, খাবার, পরিবহন, মক্কা-মদিনায় সেবা, মিনা-আরাফায় তাঁবু, লাগেজ ব্যবস্থাপনা, হারিয়ে যাওয়া হজযাত্রীকে খুঁজে বের করা, জরুরি চিকিৎসা, অভিযোগ নিষ্পত্তিসহ সার্বিক কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্ব লিড এজেন্সির। সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগও করতে হয় তাদের। সৌদি সরকারের সঙ্গে মূল যোগাযোগের ক্ষেত্রেও লিড এজেন্সির মালিকই প্রধান ভূমিকা পালন করেন। ফলে নেতৃত্বে থাকা এজেন্সির সক্ষমতা কম হলে পুরো অ্যালায়েন্সের ব্যবস্থাপনায় জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
৫২১ জন নিবন্ধন করেও লিড নয়
মারহামাহ এয়ার ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরসের নিবন্ধিত হজযাত্রী যেখানে ৩৯ জন, সেখানে একই অ্যালায়েন্সের সমন্বয়কারী এজেন্সি মোশাররফ ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস নিবন্ধন করেছে ৫২১ জন এবং জাবাল-ই নূর ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস ৩০৫ জন। অ্যালায়েন্সটির ৩৩টি সমন্বয়কারী এজেন্সিই মারহামাহর চেয়ে বেশি হজযাত্রী নিবন্ধন করেছে।
মারহামাহ এয়ার ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরসের জিএম এম গোলাম মর্তুজা বলেন, এজেন্সির মালিক সৌদি আরবে থাকেন। এ কারণে প্রচারণা চালানো সম্ভব হয়নি এবং নিবন্ধনের সংখ্যা কম হয়েছে। সৌদি সরকার অতিরিক্ত কোটা দিলে নিবন্ধন বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।
মর্তুজা বলেন, ‘সমন্বয়কারী এজেন্সিগুলো বেশি হজযাত্রী নিবন্ধন করেছে, ফলে তাদের দক্ষতা বেশি। আমরা কম করেছি– আমার দক্ষতা কম, এটা ঠিক। তবে তারা একসঙ্গে কাজ করবে এবং সহযোগিতা করবে।’
একজন হজযাত্রীও নিবন্ধন করতে না পারা মাদানী ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী জাকির হোসাইন বলেন, ‘আমার ধারণা ছিল নিবন্ধনের সময় বাড়ানো হবে। এ জন্য নিবন্ধন করিনি। এখন কয়েকজনের টাকা জমা আছে। তারা চাইলে টাকা ফেরত দেব অথবা রিপ্লেস হজের ব্যবস্থা করব।’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ২০২৬ সালে হজে ৯৮টি এজেন্সি একজন হজযাত্রীও নিবন্ধন করতে পারেনি। আরও অনেক এজেন্সির নিবন্ধন ছিল এক অঙ্কের। এ কারণে এসব এজেন্সিকে হজ কার্যক্রম থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ধর্ম মন্ত্রণালয়। পরে হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) অনুরোধে তাদের আবার কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়। এ জন্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এজেন্সিগুলোর চুক্তিও হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিটি সমন্বয়কারী এজেন্সির কমপক্ষে ৪৪ জন হজযাত্রী নিবন্ধন করার কথা। এই সংখ্যা পূরণ করতে না পারলে তাদের নিবন্ধিত হজযাত্রী অন্য কোনো যোগ্য এজেন্সির আওতায় স্থানান্তর করে হজ পালনের ব্যবস্থা করতে হবে।
‘হজ প্যাকেজ ও গাইডলাইন ২০২৭’-এর ১২(১৫) অনুচ্ছেদেও এ বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। একটি গাইডের সমসংখ্যক হজযাত্রী নিবন্ধন করলেই একটি এজেন্সি নিজস্ব হজযাত্রী সমন্বয় করতে পারবে। নির্ধারিত সংখ্যা পূরণ না হলে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির হজযাত্রী লিড এজেন্সির আওতাধীন অন্য কোনো এজেন্সিতে স্থানান্তর করতে হবে।
যোগ্য এজেন্সির তালিকা প্রকাশের সময়ও এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। যৌক্তিক কারণ ছাড়া কোনো এজেন্সি ২০২৭ সালের হজ মৌসুমে হজযাত্রী নিবন্ধন না করলে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়। নিবন্ধনের শেষ সময় ২৪ সেপ্টেম্বরের আগের দিনও মন্ত্রণালয় এজেন্সিগুলোকে সতর্ক করেছিল।
লিড হওয়ার কথা বেশি হজযাত্রীর এজেন্সির
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ বলেন, যিনি লিড দেবেন, তাঁর সক্ষমতা বা হজযাত্রী অবশ্যই বেশি হওয়া উচিত। কিন্তু লিড এজেন্সি নির্ধারণে অনেক জটিলতা হয়। এ জন্য সবার সম্মতি নিয়ে হাব চূড়ান্ত তালিকা করেছে।
কম হজযাত্রী নিবন্ধন করেও কোনো এজেন্সি লিড হয়েছে, এমন বিষয় তাঁর জানা নেই বলে উল্লেখ করেন সচিব। তিনি বলেন, ‘হাব ৩৩টি এজেন্সির নাম দিয়েছিল। সেখান থেকে ২৮টি এজেন্সিকে লিড করার অনুমতি দিয়েছে সৌদি সরকার। হাব যেভাবে তালিকা দিয়েছে, আমরা সেভাবেই পাঠিয়েছি। যাদের বেশি হজযাত্রী হবে, অবশ্যই তাদের লিড দেওয়া উচিত। কারণ সৌদি সরকারের কাছে তারাই মূল এজেন্সি হিসেবে কাজ করবেন।’
ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার বলেন, লিড এজেন্সির ন্যূনতম কোটা পূরণ না হওয়ার বিষয়টি শুনে তিনি অবাক হয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, একই অ্যালায়েন্সের যে এজেন্সি ৫২১ জন হজযাত্রী নিবন্ধন করেছে, সেটিরই লিড হওয়ার জন্য আবেদন করা উচিত ছিল। এজেন্সিটি কেন আবেদন করেনি, তা জেনে পরে জানাবেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, এজেন্সিগুলোর চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার অতিরিক্ত সাড়ে ১৭ হাজার হজযাত্রীর কোটা বাড়ানোর জন্য সৌদি সরকারের কাছে আবেদন করেছে। আবেদন নিষ্পত্তির পর শর্ত অনুযায়ী যারা কোটা পূরণ করতে পারবে না, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে হাবের মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদার বলেন, লিড এজেন্সি মন্ত্রণালয় বা হাব নির্ধারণ করেনি; এজেন্সিগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক করেছে।
হাবের মহাসচিব আরও বলেন, সব এজেন্সিকে হজ কার্যক্রমে রাখার পক্ষে হাব। কারণ, এসব এজেন্সি সরকারকে সব ধরনের ফি পরিশোধ করছে।
হাবের সভাপতি সৈয়দ গোলাম সরওয়ার বলেন, যেসব এজেন্সি ৪৪ জনের কম হজযাত্রী নিবন্ধন করেছে, তারা সমন্বয়কারী হিসেবে গণ্য হবে না।
- বিষয় :
- হজ