ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

যত বেশি শিক্ষিত তত বেশি বেকার

যত বেশি শিক্ষিত তত বেশি বেকার
×
×

 আবু হেনা মুহিব

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে চাকরির বাজারের পরিস্থিতি হাহাকারের পর্যায়ে। প্রতিবছর ২০ লাখ যুবক চাকরির বাজারের জন্য প্রস্তুত হয়। এদের মধ্যে ৯ লাখের মতো কাজের সুযোগ পায়। বাকি ১১ লাখ নতুন বেকার হিসেবে পুরোনোদের সঙ্গে যোগ দেয়। বেকারদের মধ্যে শিক্ষিতের সংখ্যাই বেশি। 

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা নিয়ে গতকাল শনিবার রাজধানীর জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ২৪২টি পদের বিপরীতে তিন লাখের বেশি প্রার্থী আবেদন করেন। শিক্ষাগত যোগ্যতা, বয়সসীমাসহ আরও কিছু শর্ত ছিল। তার পরও প্রতি পদের বিপরীতে গড়ে প্রার্থী ১০ হাজারের বেশি। এই প্রবণতা থেকে বেকারত্বের চিত্র স্পষ্ট বোঝা যায়। 
বিবিএসের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ-২০২৪-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন বলছে, বেকারদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করা বেকারদের এ হার ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ। মোট বেকারের মধ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়ালেখা শেষ করাদের হার ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। আর কোনো রকম আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, বেকারত্বে এদের হার সবচেয়ে কম– মাত্র ১ দশমিক ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ যত বেশি শিক্ষিত, তত বেশি বেকার। 

বিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সাল শেষে দেশের ২৬ লাখ ২০ হাজার মানুষ বেকার ছিল। ২০২৩ সালে সংখ্যাটি ছিল ২৪ লাখ ৬০ হাজার। সম্প্রতি আইএমএফের ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন শিক্ষিত তরুণের মধ্যে ৩৬ জন বেকার। আইএমএফ বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। তবে দক্ষতা বৃদ্ধির তুলনায় এআই গ্রহণের গতি বেশি হলে শ্রমবাজারের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

গত মঙ্গলবার বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শ্রমবাজারের পরিস্থিতি আগের অর্থবছরের চেয়ে আরও দুর্বল হয়েছে। শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, কর্মী ছাঁটাই ও কর্মঘণ্টা কমেছে। শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব সেবা ও কৃষি খাতেও ছড়িয়ে পড়ে। চাকরি হারানো নারীরা মূলত শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়েছে। আগের তিন বছরের তথ্য দিয়ে বলা হয়, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ২০২২ সালে ছিল ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির বড় উৎস হিসেবে বেসরকারি বিনিয়োগ সংকুচিত হওয়া, ব্যবসায়িক আস্থা হ্রাস, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়াকে কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়। এতে বলা হয়, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি এখন ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর্থিক সংকট ও প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতায় সরকারি বিনিয়োগও দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। বিনিয়োগে এরকম স্থবির অবস্থার কারণে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ কম হয়েছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের ফলে উদ্ভূত উচ্চ জ্বালানি মূল্য এবং তীব্র বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় শিল্প উৎপাদন কমেছে। 

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর নির্বাহী পরিচালক ও গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন সমকালকে বলেন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হওয়া ও উচ্চ বেকারত্বের এ রকম একটা বাজে পরিস্থিতির প্রধান কারণ হচ্ছে, নীতি সিদ্ধান্তের ঘাটতি। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব এবং স্থানীয় কিংবা বিশ্ববাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা তৈরি না হওয়া। এ ছাড়া সাম্প্রতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপরিকল্পিত ব্যবহার ও জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও বেগতিক করেছে। 

তাঁর মতে, এসব বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মনোযোগ দিতে হবে নীতিপ্রণেতাদের। বন্ধ শিল্পকারখানা খুলে দিয়ে উৎপাদন-চাঞ্চল্য তৈরি করতে হবে। সব শিল্পের পশ্চাৎ সংযোগ শিল্পে মনোযোগ বাড়াতে হবে। দক্ষতা উন্নয়নে চাহিদাভিত্তিক কৌশল নিতে হবে। বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রণোদনা দিয়ে উৎসাহিত করতে হবে। এই উদ্যোগগুলো নেওয়া হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সুফল মিলবেই। তা না হলে পরিস্থিতি আগামীতে আরও খারাপও হয়ে যেতে পারে। 

বিডিজবসে এই মুহূর্তে ৭০ লাখ মানুষ চাকরি খুঁজছে 
দেশের সবচেয়ে বড় অনলাইনভিত্তিক চাকরির পোর্টাল বিডিজবসে গড়ে প্রতিদিন দুই লাখ অনলাইন চাকরি আবেদন জমা পড়ে। প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডারে বর্তমানে ৭০ লাখ চাকরিপ্রার্থীর জীবনবৃত্তান্ত জমা রয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক প্রার্থী এই মুহূর্তে চাকরি খুঁজছে। 

বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর সমকালকে বলেন, চাকরিপ্রার্থীদের নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে সহায়তা করেছেন তারা। বিভিন্ন কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান তাদের ফাঁকা পদের জন্য এখানে চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে থাকে। দেশে এ ধরনের পোর্টাল আছে অন্তত ৫০টি। সব মিলে চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা কত, তা তিনি জানেন না। কেননা একই প্রার্থী একাধিক প্ল্যাটফর্মে আবেদন করেন।

বন্ধ হচ্ছে কারখানা, বেকার হচ্ছেন শ্রমিক
শিল্প পুলিশের হিসাবে ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরে ৪৫৭টি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক কারখানা ১৭০টি। বাকি ২৮৭টি পোশাকবহির্ভূত। তবে শিল্প পুলিশের তথ্যের সঙ্গে পোশাক ও বস্ত্র খাতের তিন সংগঠনের তথ্যের ফারাক রয়েছে। বিজিএমইএর উপাত্ত বলছে, দুই বছরে সংগঠনের ২২১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে গত বছর সর্বাধিক ১৪১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। আগের বছর ২০২৪ সালে বন্ধ হয়েছে ৭৭টি কারখানা। 
শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্ডাস্ট্রিঅল গ্লোবাল ইউনিয়ন ট্রেড ইউনিয়নের বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার সমকালকে জানান, দুই বছরে বন্ধ কারখানার প্রকৃত সংখ্যা এক হাজার। বড় কারখানার বাইরে ছোট কারখানা বন্ধ হলে সরকারি সংস্থা বা বাহিনী তা নথিভুক্ত করে না। তাঁর দাবি, গত দু্‌ই বছরে শুধু পোশাক খাতেই দেড় লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। অন্যান্য খাত মিলে এ সংখ্যা অনেক বেশি। 

আগামীর কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা 
সরকার তার বর্তমান পাঁচ বছরের মেয়াদে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নির্বাচনী ইশতেহারে। এই হিসাবে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ পাঁচ বছর মেয়াদ একটি কৌশলগত কাঠামো সংস্কার পরিকল্পনা নিয়েছে। সরকারে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, প্রতিবছর ২০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান হওয়ার কথা। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান নিয়ে আগামীতেও আশা দেখানো হয়নি। বলা হয়েছে, নিম্নমুখী বেসরকারি বিনিয়োগ, নিষ্প্রভ শিল্প কার্যক্রম এবং জ্বালানি খাতের ধারাবাহিক সংকট কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধিকে সীমিত করতে পারে। পূর্বাভাসে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে নিট নতুন কর্মসংস্থান হতে পারে ৬ লাখ ৩০ হাজার, যার ২০ শতাংশ আসবে শিল্প থেকে। 

দারিদ্র্য ও বৈষম্য বাড়াচ্ছে বেকারত্ব
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, দৈনিক তিন ডলারের কম ভোগব্যয় থাকলে কোনো ব্যক্তি দারিদ্র্যসীমার আওতায় পড়েন। বিশ্বব্যাংকের তৈরি এই মানদণ্ডে চার বছর ধরে বাংলাদেশে দারিদ্র্য বাড়ছে। প্রতিবেদনে করা বিশ্বব্যাংকের অনুমান বলছে, গত অর্থবছরে এ রকম দরিদ্র মানুষ সংখ্যা আগের বছরের চেয়ে ২১ লাখ বেড়েছে। ২০২২ সালে এই মানদণ্ড অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে বলে বিশ্বব্যাংক প্রাক্কলন করেছে। দারিদ্র্যের অন্যতম কারণ কাজ না থাকা। 
বিবিএস খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এরপর বিবিএসের নতুন কোনো জরিপ এখনও প্রকাশিত হয়নি। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন হলো ২০২২-এর পর প্রতিবছরই দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। গত অর্থবছরে যা ২২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। চলতি অর্থবছরে তা ২২ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে। দারিদ্র্যের সঙ্গে বৈষম্যের সম্পর্ক নিবিড়। বৈষম্য পরিমাপ করা হয় জিনি সহগ দিয়ে। এই হার যত কম, বৈষম্যও তত কম। প্রতিবেদন বলছে, গত অর্থবছরে বৈষম্য আরও বেড়েছে। 

 

আরও পড়ুন

×