সারের ডিলার নিয়োগ
৫৫ জেলার আংশিক তালিকায় অনভিজ্ঞদের প্রাধান্য
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ | ১৫:৪৭
সারা দেশে নতুন করে সারের ডিলার নিয়োগ নিয়ে দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ৫৫ জেলার আংশিক তালিকায় নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ৮০ শতাংশই অনভিজ্ঞ ও নতুন ট্রেড লাইসেন্সধারী বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সারা দেশে প্রায় পাঁচ হাজার সার ডিলার নিয়োগের বিপরীতে ৪৭ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়ে। এত বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীর মধ্য থেকে ডিলার বাছাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাদ পড়া ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের একাংশ।
বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিনের সার ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের স্ত্রী, সন্তান, ভাই ও অন্যান্য আত্মীয়কে ডিলারশিপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও দলীয় প্যাডে দেওয়া তালিকার সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত তালিকার নাম ও ক্রমের মিল পাওয়া গেছে। কোথাও আবার সংসদ সদস্য ও দলীয় নেতারা প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়েছেন। তালিকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নামও রয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, উপজেলা ও জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য প্রার্থীদের মধ্য থেকে তিনজনের নামের প্যানেল কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটিতে পাঠানোর কথা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতার বদলে রাজনৈতিক সুপারিশকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জেলা থেকে পাঠানো তালিকা যাচাই-বাছাই ছাড়াই অনুমোদন দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয় এমন অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, যোগ্যতা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় সুপারিশ এবং প্রভাবশালীদের আত্মীয়স্বজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় যাচাই-বাচাই না করেই জেলা থেকে পাঠানো তালিকা অনুমোদন করেছে। এতে সার বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়ম ও কৃষকের ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
রংপুরের পীরগাছায় ডিলার নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে। রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আখতার হোসেন। অথচ উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙ্গার স্বাক্ষরযুক্ত দলীয় প্যাডে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে দেওয়া তালিকার সঙ্গে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকার নাম ও ক্রমের হুবহু মিল পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় জানা গেছে। উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের আটটিতে দলীয় তালিকার প্রথমে থাকা ব্যক্তি এবং অন্য ইউনিয়নে দ্বিতীয় স্থানে থাকা ব্যক্তি ডিলার হিসেবে অনুমোদন পেয়েছেন।
অনুমোদন পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের পাশাপাশি অন্নদানগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমানের মেয়ে জয়িতা আক্তার জিনিও রয়েছেন। তিনি দিনাজপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী। তাঁর প্রতিষ্ঠান জয়িতা সার বিতান নামে ডিলারশিপ পেয়েছে। ইটাকুমারী ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানার শ্বশুর আলিমুদ্দিন ময়েন মোল্লা।
কুড়িগ্রাম-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. সাইফুর রহমান রানা তাঁর নির্বাচনী এলাকার ১৫টি ইউনিয়নের ডিলারদের রাজনৈতিক পরিচয়সহ একটি তালিকা প্রকাশ করেছেন। ওই তালিকায় আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের ডিলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে এ আসনের সংসদ সদস্য জামায়াতে ইসলামীর।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নে নতুন সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সোলায়মান ইসলাম মাস্টারের স্ত্রী জুঁই আক্তার। সম্প্রতি সোলায়মান ইসলামের নাম ও পদ-পদবি উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের দলীয় প্যাডে প্রকাশিত একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এ নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। তবে সোলায়মান ও তাঁর স্ত্রী দাবি করেছেন, তাঁরা এখন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন এবং নিয়ম মেনেই ডিলারশিপ পেয়েছেন। জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক খান বাবু মন্তব্য করেন, ‘সবই টাকার খেলা।’ স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক দপ্তর সম্পাদক আসপাক হোসেন মিন্টু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
মালিবাড়ি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান সদস্য হাসানুজ্জামান মাসুম মিয়া বলেন, সোলায়মানের স্ত্রীর ডিলারশিপ কীভাবে হলো, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর ডিলারশিপ বাতিল করে প্রকৃত ব্যবসায়ীকে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
গাইবান্ধা সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোশাররফ হোসেন বাবু বলেন, আওয়ামী লীগ নেতার স্ত্রীর ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়টি আগে জানতেন না। কার সুপারিশে তিনি নিয়োগ পেয়েছেন, তা তাঁর জানা নেই।
নীলফামারীর ডিমলায় দুই বিএনপি নেতার ছেলের ডিলারশিপ পাওয়া নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গয়াবাড়ী ইউনিয়নে মাবরুক বিজনেস সেন্টারের মালিক মাবরুক আল ইসলাম জোয়াদ ডিলার হয়েছেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক সহসম্পাদক। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছিল। তাঁর বাবা মনোয়ার হোসেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এবং উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য। অন্যদিকে ডিমলা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম রাব্বানী প্রধানের ছেলে তানভির রাফসান ডিমলা সদর ইউনিয়নের ডিলার হয়েছেন। তিনি খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গুদামের আয়তন, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও আর্থিক সক্ষমতার মতো শর্ত যথাযথভাবে যাচাই না করেই প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহীতে ৬৯ জন নতুন সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তালিকা বিশ্লেষণ ও মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, তাঁদের অধিকাংশই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। তালিকায় বিএনপি নেতাদের স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে ও ভাইয়ের নাম রয়েছে। একজন জামায়াতকর্মীও ডিলারশিপ পেয়েছেন। রাজশাহীর চারঘাট, বাঘা, তানোর, পুঠিয়া, মোহনপুর, পবা, গোদাগাড়ী ও দুর্গাপুরসহ বিভিন্ন এলাকার নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্যরা রয়েছেন।
চারঘাট সদর ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক বুলবুল হোসেনের স্ত্রী জিনিয়া পারভিন। সরদহ ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছেন উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আলমগীর হোসেনের স্ত্রী ইসরাত জাহান। ইউসুফপুর ইউনিয়নে নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম রবিনের স্ত্রী সুরভি আক্তার শিখা। তানোর, পুঠিয়া, পবা ও দুর্গাপুরেও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সন্তান, স্ত্রী, ভাই ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের ডিলারশিপ পাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব নিয়োগে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
রাজশাহীর এক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতিটি এলাকার জন্য তিনজনের নাম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও পছন্দের প্রার্থীর নাম তালিকার প্রথমে রাখা হয়। সংসদ সদস্যদের দেওয়া তালিকা থেকেই অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ হয়েছে। এতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বাদ পড়েছেন।
এদিকে বাগমারার ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার ডিলার নিয়োগ আটকে দিয়েছেন রাজশাহী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল বারী। তাঁর অভিযোগ, দলীয় ব্যক্তিদের ডিলার নিয়োগের চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে কৃষি সচিব ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে চিঠিও দিয়েছেন তিনি। অভিযোগ উঠেছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে তিন সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক ও কৃষি বিভাগের উপপরিচালকের উপস্থিতিতে গোপন বৈঠকে নিয়োগের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। পরে তা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, উপজেলা থেকে যাচাই-বাছাই করে পাঠানো তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। মন্ত্রণালয় নিয়োগ চূড়ান্ত করেছে। অনিয়মের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তার বলেন, তিন সংসদ সদস্যের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী নিয়োগ হয়েছে। তিনজনের নাম পাঠানো হলেও তালিকায় সংকেতপূর্ণ টিক চিহ্ন দেওয়া ছিল। ফলে অন্য প্রার্থীদের সুযোগ কার্যত সীমিত হয়ে পড়ে।
মেহেরপুরে নতুন ২২ জন সার ডিলার নিয়োগ নিয়েও দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশ জেলা বিএনপির সভাপতি জাভেদ মাসুদ মিল্টন ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসানের অনুসারী। তাঁদের মধ্যে নেতাদের ছেলে, ভাই, ভাতিজা ও অন্যান্য আত্মীয় রয়েছেন। এতে বাদ পড়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ অরুণের অনুসারী, জামায়াতের নেতাকর্মী ও অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের একাংশ।
মেহেরপুর পৌরসভায় ডিলার হয়েছেন পৌর বিএনপির সভাপতি আব্দুল লতিফের ছেলে তানভির আহমেদ। সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফয়েজ মহাম্মদের ভাই এনামুল হক এবং আমদহ ইউনিয়নে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসানের ভাতিজা সাবিক হাসান ডিলারশিপ পেয়েছেন। অন্যান্য ইউনিয়নেও বিএনপি নেতাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়োগ পাওয়ার তথ্য রয়েছে।
মেহেরপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নির্বাহী সদস্য আ ক ম আনোয়ারুল হক কালু বলেন, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ছিলেন। কোনো কারণ ছাড়াই কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি করা হয়েছে। নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগেরই ব্যবসায়ী হিসেবে পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে স্থানীয় সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের ছেলে ও নিকটাত্মীয়দের তিনটি ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গোকর্ণ ইউনিয়নে তাঁর ছেলে আদনান সাদী, নাসিরনগর সদর ইউনিয়নে বোনজামাই আরক মিয়া এবং গোয়ালনগর ইউনিয়নে ভাগ্নের স্ত্রী নুরুন্নাহার আক্তার স্বর্ণা ডিলারশিপ পেয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসনও তাঁদের নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
- বিষয় :
- সার
- কৃষি
- কৃষি মন্ত্রণালয়