আন্তর্জাতিক ই-বর্জ্য দিবস আজ
বাড়ছে ই-বর্জ্য, নেই নিরাপদ ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকিতে পরিবেশ
হাসনাইন ইমতিয়াজ
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, ফ্রিজ কিংবা ব্যাটারি অকেজো হলে অনেক সময় সেগুলো ঘরেই পড়ে থাকে। কেউ বিক্রি করেন ভাঙাড়ি দোকানে, কেউ ফেলে দেন সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে। কোথাও এসব যন্ত্রপাতি ভেঙে তামা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু বের করা হয়, কোথাও পোড়ানো হয় তার ও প্লাস্টিক। এর মাধ্যমে সিসা, পারদ ও ক্যাডমিয়ামের মতো ক্ষতিকর উপাদান ছড়িয়ে পড়তে পারে মাটি, পানি ও বাতাসে। এতে ঝুঁকিতে পড়েন বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত কাজে যুক্ত শ্রমিকরাও। অথচ দেশে ই-বর্জ্য সংগ্রহ, নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পুনর্ব্যবহারের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
এমন অব্যবস্থাপনায় আজ বুধবার বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ই-বর্জ্য দিবস। এদিকে বিশ্বে দ্রুত বাড়ছে ইলেকট্রনিক বর্জ্যের পরিমাণ। জাতিসংঘের গ্লোবাল ই-ওয়েস্ট মনিটর ২০২৪ অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বে ৬ কোটি ২০ লাখ টন ই-বর্জ্য তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশেও বাড়ছে পুরোনো ও অকেজো ইলেকট্রনিক পণ্যের পরিমাণ।
দেশে বছরে কতটুকু ই-বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, এবং সেগুলো কতটা নিরাপদে পুনর্ব্যবহার হচ্ছে আর কতটা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই। একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশে ই-বর্জ্যের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ১০ হাজার টন। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ টনে। ওই সমীক্ষায় বছরে প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধির হার ধরে ২০৩৫ সালে ই-বর্জ্যের পরিমাণ ৪৬ লাখ টনে পৌঁছানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা করে। ৩০ ডিসেম্বর প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, ভোক্তা পর্যায়ে ই-বর্জ্য সংগ্রহের প্রায় ৯৭ শতাংশ হয় অনানুষ্ঠানিক খাতে। এ খাতের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান মাত্র সাতটি।
বিষাক্ত উপাদানে স্বাস্থ্যঝুঁকি
ই-বর্জ্যে থাকা সিসা, পারদ ও ক্যাডমিয়ামের মতো ক্ষতিকর পদার্থ অনিরাপদভাবে ছড়িয়ে পড়লে দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে। স্বাস্থ্যবিদদের মতে সিসার সংস্পর্শ শিশুদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। পারদ স্নায়ুতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। ক্যাডমিয়াম ক্ষতি করতে পারে কিডনি ও হাড়ের। পুরোনো যন্ত্রপাতি ভাঙা, পোড়ানো কিংবা রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ধাতু আলাদা করার সময় যথাযথ সুরক্ষা না থাকলে এসব উপাদানের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি বাড়ে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন ই-বর্জ্য সংগ্রহ, বাছাই ও প্রক্রিয়াজাত কাজে যুক্ত শ্রমিকরা। অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজের সময় অনেক ক্ষেত্রে গ্লাভস, চোখ ও শ্বাসযন্ত্রের সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করা হয় না। খোলা জায়গায় তার ও প্লাস্টিক পোড়ালে ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম কণার সংস্পর্শে আসেন শ্রমিকরা। একই ঝুঁকিতে পড়তে পারেন আশপাশের বাসিন্দারাও। বিষাক্ত উপাদান মাটি ও পানিতে মিশলে দূষণের প্রভাব কর্মস্থলের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এই ঝুঁকি কমাতে যন্ত্রপাতি নিরাপদে খোলা, বিপজ্জনক উপাদান আলাদা করা, সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার এবং ক্ষতিকর বর্জ্য পৃথকভাবে সংরক্ষণ জরুরি। কিন্তু ই-বর্জ্যের বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত হওয়ায় এসব সুরক্ষার তেমন নিশ্চয়তা নেই।
অকেজো পণ্য ঘরে, সংগ্রহের ব্যবস্থা নেই
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার শুরুতেই রয়েছে বড় ঘাটতি। টিআইবির গবেষণায় ৬৭৫ জনের ওপর পরিচালিত অনলাইন জরিপে ৮৮ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, অকেজো ইলেকট্রনিক পণ্য নিরাপদে ফেলার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা পান না। ৭২ শতাংশের ঘরেই পড়ে থাকে অকেজো হওয়া পণ্য। মাত্র ১৫ শতাংশ তা ফেলে দিয়েছেন বা অন্যভাবে সরিয়েছেন। তাদের অনেকে পুরোনো পণ্য বিক্রি করেছেন ভাঙাড়ি ব্যবসায়ীদের কাছে। ৭৩ শতাংশ জানিয়েছেন, অকেজো পণ্য ফেরত নেওয়ার কোনো প্রস্তাব তারা পান না।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, পণ্যের ব্যবহার শেষ হলে তা কোথায় জমা দিতে হবে, কে সংগ্রহ করবে এবং কীভাবে নিরাপদে প্রক্রিয়াজাত হবে, তা সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট নয়। ঘরে পড়ে থাকা কিংবা ভাঙারি দোকানে বিক্রি হওয়া ই-বর্জ্য শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে, তারও কার্যকর নজরদারি নেই।
বিধিমালা হলেও বাস্তবায়ন দুর্বল
ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ২০২১ সালে বিধিমালা করা হলেও বাস্তবায়ন দুর্বল। উৎপাদক ও আমদানিকারকদের পুরোনো পণ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ধাপে ধাপে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর কথা রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত সংগ্রহকেন্দ্র নেই, নজরদারিও দুর্বল।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিটিআরসির নিবন্ধনেও সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। বিটিআরসিতে নিবন্ধিত ১৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সাতটি পরিবেশ অধিদপ্তরে নিবন্ধিত নয়। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতেও ই-বর্জ্য জমা দেওয়ার নির্দিষ্ট স্থান নেই। ফলে বিধিমালা থাকলেও নিরাপদ সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
আমদানি-রপ্তানিতেও অনিয়মের অভিযোগ
ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা আমদানি-রপ্তানিতে প্রভাব ফেলছে। কাস্টমসের তথ্যের ভিত্তিতে টিআইবির গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৪ হাজার ৯৮৫ টন ই-বর্জ্য উপাদান আমদানি হয়েছে। একই সময়ে রপ্তানি করা হয়েছে ৪ হাজার ৪০ টন।
গবেষণায় বলা হয়েছে, অনানুষ্ঠানিক খাতের কিছু পাইকারি ব্যবসায়ী প্রয়োজনীয় নজরদারি ছাড়াই প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ডসহ বিভিন্ন ই-বর্জ্য উপাদান বিদেশে পাঠাচ্ছেন। কিছু নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাসেল কনভেনশনের আওতায় অনুমোদিত পরিমাণের চেয়ে বেশি বর্জ্য রপ্তানির অভিযোগও রয়েছে। নিবন্ধন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র পেতে নিয়মবহির্ভূত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ জানিয়েছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা।
বর্জ্য নয়, মূল্যবান সম্পদও
ই-বর্জ্যে রয়েছে তামা, সোনা, রুপা, অ্যালুমিনিয়াম, লোহা, নিকেল ও প্যালাডিয়ামের মতো মূল্যবান ধাতু। পুরোনো মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, সার্কিট বোর্ড, তার ও ব্যাটারি থেকে এসব উপাদান উদ্ধার করে শিল্পে পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব। বিশেষ করে সার্কিট বোর্ড, মেমোরি চিপ ও প্রসেসরে সোনা, রুপাসহ বিভিন্ন মূল্যবান ধাতু থাকে। অন্যদিকে, তার ও কেবল থেকে তামা এবং যন্ত্রপাতির কাঠামো থেকে অ্যালুমিনিয়াম ও লোহা সংগ্রহ করা যায়। এসব উপাদান পুনর্ব্যবহার করা গেলে কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ই-বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২৮ থেকে ৩০ লাখ টন ই-বর্জ্য তৈরি হয়। এ খাতের সম্ভাব্য বাজারমূল্য ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই বাজারমূল্যের কতটা মূল্যবান ধাতু থেকে আসে এবং তার কতটা দেশে উদ্ধার বা পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, উন্নত প্রযুক্তি ও নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণের ঘাটতিতে ই-বর্জ্যের মূল্যবান উপাদানের পুরো অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
টিআইবির গবেষণায় ঢাকার অনানুষ্ঠানিক সংগ্রহস্থলগুলোতে বছরে প্রায় ১ হাজার ১৭৩ টন ই-বর্জ্য সংগ্রহের হিসাব দেওয়া হয়েছে। এসব বর্জ্য সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করা গেলে প্রায় ৩১ টন তামা উদ্ধার সম্ভব। গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, শুধু এই তামার বাজারমূল্য বছরে সাড়ে ৩ কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
সুমন আহমেদের মতে, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ নিরাপদ করতে হবে। বিষাক্ত অংশ আলাদা করে নিষ্পত্তি, শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং উৎপাদক ও আমদানিকারকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
- বিষয় :
- দিবস আজ