ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

পুষ্প

সুগন্ধি ফুল পানামা- রোজ

সুগন্ধি ফুল পানামা- রোজ
×
×

জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ফোটা পানামা- রোজ ফুল লেখক

মৃত্যুঞ্জয় রায়

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫৩ | আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত বছর অক্টোবরে গিয়েছিলাম মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে। সেখানে নার্সারির ভেতরে দেখতে পেয়েছিলাম থোকা থোকা পানামা-রোজ ফুল। টকটকে কমলা-লাল রং, আগুনের মতো গনগনে চেহারা। ফুল ফুটে সবুজ ঝোপের মতো বয়স্ক গাছটা আলো করে ফেলেছিল। মালীরা জল ছিটিয়ে হয়তো তার রুদ্ররূপ খানিকটা প্রশমনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু ওই জলস্পর্শে সেসব ফুল যেন আরও স্নিগ্ধ হয়ে উঠেছে। দেখে মনে হচ্ছিল শরৎ সকালের শিশির-ধোয়া ফুল। 

পানামা-রোজ নামের সঙ্গে ‘রোজ’ শব্দটা থাকলেও গোলাপের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। বরং দেখতে খানিকটা রঙ্গন ফুলের মতো। ফুলটির জন্মভূমি যেহেতু পানামা ও কিউবা, সে কারণে এর নামের সঙ্গে পানামা যুক্ত হয়েছে। এর কোনো বাংলা নামকরণ করা হয়নি, ইংরেজি নামের সরল বাংলা নাম হতে পারে পানামা গোলাপ। 

তবে এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Rondeletia odorata, গোত্র রুবিয়েসি। সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশ থেকে আসা এ উদ্ভিদটি জানা মতে, এখনও এ দেশের উদ্ভিদ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম ডেটাবেজে ৩২৩টি গোত্রের ২৫৯২টি গণের ৯৫৮৯৮টি রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়েছে। সেখানেও এটি নথিভুক্ত করা হয়নি।

পৃথিবীতে রনডেলশিয়া গণের ১৬০টি প্রজাতি রয়েছে। এ দেশে রনডেলশিয়া গণের অন্তত দুটি প্রজাতি আছে– Rondeletia odorata এবং Rondeltia leucophylla। এ বছর জানুয়ারিতে সাভারের খাগানে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভর্সিটির ক্যাম্পাসে গিয়ে মূল ভবনের রাস্তার ধারে বেড়া বা হেজপ্লান্ট হিসেবে দেখেছিলাম দ্বিতীয় প্রজাতির ফুলটি। ফুলের রং গোলাপি, সেসব ফুলের কেন্দ্রস্থলে প্রথমোক্ত প্রজাতির ফুলের মতো হলুদ বলয়চিহ্ন নেই। কিন্তু ফুলের চেহারা ও ফোটার ধরন প্রায় একই। পাতা লম্বা ও ফুল গোলাপি। 

দৃষ্টিনন্দন পানামা- রোজ

গণগত নাম ‘রনডেলশিয়া’ রাখা হয়েছে মঁপেলিয়ের বিখ্যাত ফরাসি উদ্ভিদবিদ, চিকিৎসক, জলজ জীববিজ্ঞানী ও প্রকৃতিবিদ গুইলাম রন্ডেলেট (১৫০৭-১৫৬৬)-এর নামের সম্মানে। কার্ল লিনিয়াস ১৭৫৩ সালে এই নামকরণ করেন। প্রজাতিগত নামের শেষাংশ লাতিন শব্দ ‘ওডোরাটা’ হয়েছে ফুলের সুগন্ধের কারণে। রনডেলশিয়া ওডোরাটার তিনটি উপপ্রজাতি রয়েছে– Rondeletia odorata subsp. bullata, Rondeletia odorata subsp. grandifolia এবং Rondeletia odorata subsp. odorata। উদ্ভিদটি নিয়ে আরও নিবিড় গবেষণা হতে পারে। 

তিনটি উপপ্রজাতির গাছের চেহারার মধ্যে সূক্ষ্ম কিছু পার্থক্য রয়েছে। যেমন– প্রথম উপপ্রজাতির পাতা চামড়ার মতো শক্ত ও উপরিভাগ বুলেটের মতো কুঁচকানো বা ফোসকার মতো অমসৃণ। দ্বিতীয় উপপ্রজাতির পাতা বড়। তৃতীয় উপপ্রজাতির পাতা পুরু, চামড়ার মতো, ডিম্বাকৃতি থেকে উপবৃত্তাকার, গাঢ় সবুজ, দুই থেকে পাঁচ সেন্টিমিটার লম্বা, পাতার কিনারা সামান্য ঢেউ খেলানো ও অখণ্ড। এ উপপ্রজাতির অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর ফুল হালকা মিষ্টি সুগন্ধযুক্ত, উজ্জ্বল লাল বা কমলা-লাল, নলাকার ফুল গুচ্ছাকারে ফোটে। পাপড়িগুলো স্পষ্ট গোলাকার ও কেন্দ্রের অংশ সোনালি-হলুদ। এটিই প্রধানত শোভাবর্ধক উদ্ভিদ হিসেবে বাগানে লাগানো হয়। তবে সব উপপ্রজাতির গাছই গুল্ম প্রকৃতির, চিরসবুজ, বহুবর্ষজীবী ও উচ্চতা দুই মিটারের বেশি হয় না। ছেঁটে রাখলে গাছ বেশ ঝোপালো হয়।
এ উদ্ভিদের পাতাগুলো কাণ্ডে বিপরীতমুখীভাবে সাজানো থাকে, আকৃতি ডিম্বাকার থেকে উপবৃত্তাকার বা দীর্ঘায়ত-উপবৃত্তাকার, পাঁচ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, চর্মবৎ। ডালের আগায় গুচ্ছাকারে ফুল ফোটে। প্রতিটি গুচ্ছে অনেক ফুল থাকে। ফুলের নলাকার অংশটি ১২ থেকে ২০ মিলিমিটার লম্বা, পাপড়ি প্রায় গোলাকার, কিনারা হলকা কুঁচকানো, অগ্রভাগ ভোঁতা বা গোলাকার। সাধারণত অক্টোবর থেকে মে পর্যন্ত ফুল ফোটে ও ফল ধরে। ফল ক্যাপসুল গোলাকার অথবা কিছুটা চ্যাপ্টা-গোলাকার, ফলের ব্যাস তিন থেকে চার মিলিমিটার। ফলের উপরিভাগ ঘন ও সূক্ষ্ম রোমাবৃত। 

পানামা রোজের চারা তৈরির সবচেয়ে ভালো উপায় হলো কাণ্ড কেটে কলম করা বা কাটিং। গিঁটযুক্ত কাণ্ড বা পেন্সিলের মতো সরু ডাল ত্যারচা করে ১০-১৫ সেন্টিমিটার অংশ কেটে গিঁটসহ সে অংশটি তেরচা করে ভেজা মাটিতে পুঁতে রাখলে তিন থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে সে গিঁট থেকে শিকড় গজায় ও ওপরের গিঁট থেকে পাতা ছাড়ে। বসন্ত ও গ্রীষ্মের প্রথম পর্যন্ত কলম করার উপযুক্ত সময়। আধো-ছায়া ও রোদেলা স্থানে গাছ ভালো হয়। রোদে জন্মানো গাছে ফুলের রং ভালো হয়। বেশি ফুল পাওয়ার জন্য মাঝে মাঝে গাছ ছাঁটতে হয়। বাগানে ও বড় টবে এ গাছ লাগানো যায়। টবে লাগালে দুই-তিন বছর পরপর টবের মাটি বদলে দিতে হয়।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
 

আরও পড়ুন

×