সরকারকে ৩৮১ কোটি টাকা বাড়তি গুনতে হতে পারে
হাসনাইন ইমতিয়াজ
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩৬ | আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের প্রথম সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের চুক্তিমূল্য বাড়ানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী, প্রস্তাবিত দরের মধ্যে সব ধরনের কর, ভ্যাট ও অন্যান্য চার্জ অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা। তবে নির্বাচিত ঠিকাদারের মূল প্রস্তাবের সঙ্গে নতুন করে এসব খাতে ৩ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩৮১ কোটি টাকা যোগ করা হয়েছে। এতে চুক্তিমূল্য প্রায় ২৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। এই বাড়তি অর্থ সরকারকে পরিশোধ করতে হতে পারে।
সূত্র জানায়, ৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকার এসপিএম প্রকল্পের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ পেয়েছে ইন্দোনেশিয়ার পিটি পার্টামিনা ট্রান্স কন্টিনেন্টাল (পিটিকে)। প্রতিষ্ঠানটি কর, ভ্যাটসহ ১২ কোটি ৮০ লাখ ডলার বা প্রায় ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকার দরপ্রস্তাব দিয়ে সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দরদাতা নির্বাচিত হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, দর মূল্যায়নের সময় প্রস্তাবটিকে কর ও ভ্যাটবহির্ভূত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরে চুক্তি চূড়ান্ত করার সময় এসব খাতে আরও ৩ কোটি ১০ লাখ ডলার যোগ করা হয়েছে।
দরপত্র আহ্বানপত্রের (আইটিটি) ২৭.৯ ধারা অনুযায়ী, দরদাতার প্রস্তাবিত মূল্যের মধ্যেই সব ধরনের প্রযোজ্য কর, ভ্যাট, শুল্ক ও অন্যান্য চার্জ অন্তর্ভুক্ত রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পিটিকেও তাদের প্রস্তাবে দরপত্রের সব শর্ত মেনে চলার কথা জানিয়েছিল।
এ ছাড়া চুক্তির সাধারণ শর্তাবলির (জিসিসি) ১৮.১ ধারা অনুযায়ী, কর ও শুল্ক পরিশোধের দায় ঠিকাদারের। ৬২.২ ধারায় বলা হয়েছে, চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলে এসব ব্যয়ের কারণে চুক্তিমূল্য সমন্বয় করা যাবে না।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দর মূল্যায়নের পর মূল প্রস্তাবের সঙ্গে আবার কর ও ভ্যাট যোগ করা দরপত্রের এসব শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এতে ঠিকাদারের প্রস্তাবিত মূল্যের চেয়ে সরকারের ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
ক্রয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র জানায়, দরপত্রে ইউনিট রেট ও মোট দরপ্রস্তাবের মধ্যে সব ধরনের প্রযোজ্য কর, ভ্যাট, শুল্ক ও অন্যান্য চার্জ অন্তর্ভুক্ত রাখার কথা স্পষ্টভাবে বলা ছিল।
যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাড়তি অর্থ যোগ করার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) বিষয়ে পরামর্শকের সুপারিশের ভিত্তিতে কর ও ভ্যাট যোগ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে রাজি হননি তিনি।
এ বিষয়ে জানতে এসপিএম-এর দায়িত্বে থাকা পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মো. জিয়াউল হাসানকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তাঁর তরফ থেকে সাড়া মেলেনি।
এদিকে, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ঠিকাদার নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতার কারণে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে দেশের প্রথম এসপিএম। ফলে গভীর সমুদ্রে বড় জাহাজ থেকে তেল খালাস করে তীরের সংরক্ষণাগারে নিতে এখনও ছোট জাহাজের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বিপিসিকে। এতে পরিবহন ব্যয়ও বেশি হচ্ছে।
চীনের চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড (সিপিপিইসি) নির্মিত প্রকল্পটি ২০২৪ সালের আগস্টে বিপিসির কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পটির ত্রুটি সংশোধন ও গ্যারান্টির মেয়াদ শেষ হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। কয়েক দফা সংশোধনের পর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকায়। খরচ বড় আকারে বাড়লেও প্রকল্পটির সফল পরীক্ষা ও কমিশনিং এখনও শেষ হয়নি। সূত্রের দাবি, একাধিকবার পরীক্ষামূলকভাবে চালানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ফলে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।
এসপিএম চালু হলে গভীর সমুদ্রে অবস্থানরত বড় ট্যাঙ্কার থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে তীরের সংরক্ষণ ট্যাঙ্কে জ্বালানি নেওয়া যাবে। প্রকল্পের আওতায় বঙ্গোপসাগরের তলদেশ দিয়ে স্থাপিত অংশসহ মোট ২২০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ছয়টি সংরক্ষণ ট্যাঙ্কের সম্মিলিত ধারণক্ষমতা ২ লাখ ৪০ হাজার টন। এর মধ্যে ১ লাখ ৫০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল এবং ৯০ হাজার টন গ্যাস অয়েল রাখা যাবে।
প্রকল্পটি চালু হলে এক লাখ ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার ট্যাঙ্কার থেকে ৪৮ ঘণ্টায় জ্বালানি খালাস করা সম্ভব হবে। বর্তমানে একই কাজে প্রায় ১১ দিন লাগে। এসপিএম চালু হলে লাইটার জাহাজের ওপর নির্ভরতা কমবে। বর্তমানে সমুদ্রে অবস্থানরত বড় জাহাজ থেকে তীরে জ্বালানি আনতে প্রতি টনে প্রায় ৫.৫০ ডলার বা ৬৭৭ টাকা খরচ হয়।
বাজারসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এসপিএম পুরোপুরি চালু হলে জ্বালানি পরিবহন ও হ্যান্ডলিং ব্যয় কমিয়ে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। তবে প্রকল্পটি চালু করতে দীর্ঘ বিলম্বের পাশাপাশি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির মূল্য বাড়ানোর অভিযোগে ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।