ক্যান্টন ফেয়ারে নতুন ব্যবসার সম্ভাবনা খুঁজছেন বাংলাদেশিরা
জাহিদুর রহমান, গুয়াংজু (চীন) থেকে
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
চীনের গুয়াংজুতে ১৪০তম চীন আমদানি-রপ্তানি মেলার (ক্যান্টন ফেয়ার) বিশাল প্রদর্শনী কেন্দ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীরা। গতকাল বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া এই মেলায় কেউ খুঁজছেন কারখানার যন্ত্রপাতি, কেউ বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য, কেউবা কৃষি যন্ত্রপাতি। পণ্যের মান, দাম, উৎপাদন সক্ষমতা আর সরবরাহের শর্ত নিয়ে চলছে দর-কষাকষি। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরাও এসেছেন নিজেদের প্রয়োজনীয় পণ্য ও নতুন ব্যবসার সম্ভাবনা খুঁজতে।
ঢাকার কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবসায়ী আব্দুর রশীদের কাছে এই মেলা নতুন পণ্য সংগ্রহের বড় সুযোগ। তিনি বলেন, বিশ্বের বৃহত্তম পণ্যমেলাগুলোর একটি ক্যান্টন ফেয়ারে এসে পছন্দমতো পণ্য খুঁজে ব্যবসা করা যায়। উদ্যোক্তাদের জন্য এটি অনেক বড় সুযোগ।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মাহমুদুর রহমান এসেছেন কৃষিযন্ত্রের সম্ভাবনা যাচাই করতে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে কৃষি যন্ত্রপাতির রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। চীন এ খাতের অন্যতম বড় উৎপাদক। মান ও দামের সমন্বয় বিবেচনায় রেখে নতুন পণ্য এবং সরবরাহকারী খুঁজতেই তাঁর এই মেলায় আসা।
বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের অনেকের কাছে এই মেলা চীন থেকে পণ্য সংগ্রহের জায়গা। এখানে উৎপাদকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, পণ্যের নমুনা পরীক্ষা, প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা নেওয়া এবং সরবরাহের শর্ত নিয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি ক্রেতার কাছে নিজেদের পণ্য তুলে ধরার সুযোগও তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণের গুরুত্ব বোঝা যায় মেলায় তাদের উপস্থিতি দেখে। এবারের ক্যান্টন ফেয়ারে বাংলাদেশ শীর্ষ ১০ ক্রেতা পাঠানো দেশের তালিকায় রয়েছে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবার ৩০ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নিয়েছে। প্রদর্শনীর মোট আয়তন ১৫ লাখ ৫০ হাজার বর্গমিটার।
ক্যান্টন ফেয়ারের প্রথম পর্বে উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, কৃষি যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস, নতুন জ্বালানির গাড়ি, শিল্প স্বয়ংক্রিয়করণ ও বুদ্ধিমান উৎপাদন প্রযুক্তি গুরুত্ব পাচ্ছে। দ্বিতীয় পর্বে রয়েছে আসবাব, গৃহস্থালি সামগ্রী ও সাজসজ্জার পণ্য। তৃতীয় পর্বে স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা সরঞ্জাম, খেলনা, পোশাক ও জীবনযাপন সংশ্লিষ্ট পণ্য রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহকারী ও প্রযুক্তি খোঁজার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামাল পান্না মেলা ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতা খুঁজে পাওয়া কঠিন। বড় একটি আন্তর্জাতিক মেলায় একই জায়গায় বিভিন্ন দেশের ক্রেতা ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বাংলাদেশ এখনও প্রধানত চীন থেকে পণ্য কেনার জন্য পরিচিত হলেও ভবিষ্যতে চীনের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য বিক্রির সুযোগও বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের মতো খাতের উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরির চেষ্টা করতে পারেন। তবে এসব পণ্যের ক্ষেত্রে চীনের বাজারে প্রবেশের শর্ত, আমদানি অনুমোদন, মান সনদ, শুল্ক, সরবরাহ ব্যবস্থা ও ক্রেতার চাহিদা সম্পর্কে আগে থেকেই প্রস্তুতি প্রয়োজন। শুধু মেলায় স্টল নেওয়া কিংবা পণ্যের নমুনা প্রদর্শন করলেই রপ্তানি বাড়বে না। কোন পণ্যের জন্য চীনে বাস্তব চাহিদা রয়েছে, স্থানীয় উৎপাদকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সুবিধা কোথায় এবং নিয়মিত সরবরাহের সক্ষমতা কতটা, সেসব বিষয় যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি চীনা আমদানিকারকদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলাও জরুরি। বাংলাদেশের জন্য আরেকটি সম্ভাবনা রয়েছে প্রযুক্তি ও উৎপাদন সহযোগিতায়। ক্যান্টন ফেয়ারে যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে স্থানীয় কারখানার উৎপাদন ব্যয় কমানো, পণ্যের মান উন্নয়ন এবং নতুন পণ্য তৈরির সুযোগ খুঁজতে পারেন উদ্যোক্তারা। তবে এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বাজারের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
১৯৫৭ সালে যাত্রা শুরু করা ক্যান্টন ফেয়ার এবার প্রতিষ্ঠার ৭০ বছর পূর্ণ করেছে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও গুয়াংজু প্রাদেশিক সরকার যৌথভাবে মেলার আয়োজন করে। গতকাল গুয়াংজুতে ১৪০তম আসরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং মূলবক্তব্য দেন।
লি ছিয়াং বলেন, ক্যান্টন ফেয়ারের মাধ্যমে বিশ্বের মানুষ চীনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির প্রাণশক্তি দেখতে পেয়েছে। চীন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারের সংযোগ বাড়ানো এবং উন্মুক্ত বিশ্ব অর্থনীতি গড়ে তোলার পক্ষে কাজ করবে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে চীনে ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশে বিনিয়োগেও সমর্থন অব্যাহত থাকবে।
অনুষ্ঠানে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মহাপরিচালক এনগোজি ওকোনজো-ইওয়েলা ভিডিওবার্তায় চীনের উন্নয়নকে বিশ্বের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। অনুষ্ঠানে প্রায় ৯০টি দেশ ও অঞ্চলের সাত শতাধিক প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
- বিষয় :
- বাংলাদেশি