ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

কর্মসংস্থান স্থবির, অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতিতে সংকট তীব্র

কর্মসংস্থান স্থবির, অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতিতে সংকট তীব্র
×
×

ছবি- এআই দিয়ে তৈরি

আবু হেনা মুহিব

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৪ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:২২

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঘর ভাড়া নিয়ে খুব বাজে অভিজ্ঞতা আছে পোশাকশ্রমিক মারুফ মজুমদারের। সেটি দুঃসহ অপমানের। সেই অভিজ্ঞতার পর থেকে নিজের খাওয়া-পরার আগে বাড়ি ভাড়ার টাকাটা জোগাড় করে রাখতে হয়। ঘরে বৃদ্ধ মা ও অবুঝ তিন কন্যা। ভাতের বন্দোবস্তও না রেখে হয় না। এ দুই খরচের টাকা হাতে রেখে বাদবাকি ভাবনা। এ রকম খরচের খতিয়ানে মাসের প্রথম সপ্তাহে মারুফের হাত খালি হয়ে যায়। দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু হয় টানাটানি। তৃতীয় সপ্তাহ যেন আর চলে না। মাসের খরচ নিয়ে এই টানাটানির কারণে এক প্রতিবেশীর কাছে তিনি এখন ঋণখেলাপি। আগামী মাসের বেতন পেলে টাকা ফেরত দেবেন–এ ওয়াদায় পাঁচ মাস আগে সাত হাজার টাকা ধার করেন। তারপর প্রতি মাসেই চলছে এ ওয়াদা ভাঙা। 

মজুরির চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি হওয়ায় এ রকম ধারদেনায় চলছে মারুফের জীবন। গত কয়েক বছর ধরে যে হারে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, সে হারে মজুরি বাড়ছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএ) হালনাগাদ তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ, যেখানে মজুরি বেড়েছে ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, অর্থাৎ দরিদ্র মানুষের মজুরি নিয়ে সূচক প্রকাশ করে থাকে বিবিএস। শ্রমবাজারে এ ধরনের শ্রমিকের সংখ্যা মোট শ্রমিকের ৮৫ শতাংশ। 

ব্যক্তিগত ঋণখেলাপি এ রকম হাজারো মারুফকে নিয়ে দেশে দারিদ্র্য পরিস্থিতি এক মানবেতর রূপ নিয়েছে। টানা চার বছর ধরে এই পরিস্থিতি। দরিদ্ররা হয়ে যাচ্ছে অতিদরিদ্র। দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা গোষ্ঠী হয়ে যাচ্ছে দরিদ্র। জনসংখ্যার বড় একটা অংশ নিম্নবিত্ত থেকে নেমে যাচ্ছে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে। এদের সংখ্যা ছয় কোটিরও বেশি। ফলে ক্রমেই বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের চক্রে এগোচ্ছে দেশ। 
কর্মসংস্থান স্থবির হয়ে পড়া এবং বাজারে অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতির কারণে এ সংকট তীব্র রূপ নিয়েছে। এই পরিস্থিতি বাসস্থান, খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারের বহুমুখী অভাব মানুষের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। দেশে আজ এ রকম বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস এসেছে। জাতিসংঘ ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত তিন বছরের মূল প্রতিপাদ্য ঠিক করেছে ‘শান্তি ও মানবাধিকারের জন্য ঐক্যবদ্ধ’; এ বছরের উপবিষয় ‘সবার জন্য নিরাপদ ঘর’। বিশ্বব্যাপী চরম দারিদ্র্য, ক্ষুধা এবং বৈষম্য দূর করার বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করাই এর লক্ষ্য।

দেশে দরিদ্র এখন পাঁচ কোটি ১৩ লাখ মানুষ
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার-পিপিআরসির এক জরিপ প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালে দেশের সার্বিক দারিদ্র্য বেড়ে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালে প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই বছর দেশে জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার। বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় ১ দশমিক ২২ শতাংশ হারে। মৃত্যুহার প্রতি হাজারে ৬ দশমিক ১ জন। এ হিসাবে ২০২৫ সালে দেশে জনসংখ্যা ছিল ১৭ কোটি ৬১ লাখ। এর মধ্যে চার কোটি ৯২ লাখ মানুষ দরিদ্র। 

সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনীতির হালনাগাদ গতিচিত্র নিয়ে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। ফলে দেশে মোট দরিদ্র মানুষের সংখ্যা এখন পাঁচ কোটি ১৩ লাখ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, দৈনিক তিন ডলারের কম ভোগব্যয় থাকলে কোনো ব্যক্তি দারিদ্র্যসীমার আওতায় পড়েন। 
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং-সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, যে সময়ে দারিদ্র্য কমানোর কথা, সে সময়ে টানা চার বছর ধরে দারিদ্র্য বাড়ার প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এর অর্থ, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, প্রকৃত আয় কমে যাওয়া এবং সামাজিক সুরক্ষার সীমাবদ্ধতা সাধারণ মানুষকে আরও বেশি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দারিদ্র্য বিমোচন শুধু সরকারি পরিসংখ্যান কিংবা দিবসকেন্দ্রিক প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়; এটি মানুষের খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার প্রশ্ন। দারিদ্র্য বাড়ার কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, বৈষম্য কমানো ও প্রান্তিক মানুষের টেকসই কর্মসংস্থানে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

১ কোটি ৭৮ লাখ চরম দারিদ্র্য 
চরম বা অতিদারিদ্র্যের চিত্র আরও উদ্বেগের। বিবিএসের ২০২২ সালের জরিপে অতিদারিদ্র্য নেমেছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশে। পিপিআরসির ২০২৫ সালের জরিপে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালের হারে ১০ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ অতিদরিদ্র। অর্থাৎ প্রতি ১০ জনে একজন চরম অভাবে থাকে। মোট জনসংখ্যার হিসাবে দেশের এক কোটি ৭৮ লাখ চরম দারিদ্র্য। 

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক-এমপিআই অনুযায়ী বাসস্থান, পুষ্টি, সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা–এই মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অভাবেই তৈরি হয় বহুমাত্রিক দারিদ্র্য। শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। 

ঝুঁকিতে ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ 
দেশের ছয় কোটি ২০ লাখেও বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এরা নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির। ‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও বৈষম্য মূল্যায়ন ২০২৫’ প্রতিবেদনে এই আশঙ্কার কথা জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ঝুঁকির কারণ হিসেবে অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যে কোনো অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়ের কথা বলা হয় প্রতিবেদনে। 
বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০১০ থেকে ২০২২ সাল এই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে দারিদ্র্য হ্রাস করেছে। ফলে দুই কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। এ ছাড়া অতিদারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে ৯০ লাখ মানুষ। তাদের জীবনমানের উন্নতি হয়েছে, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, পয়োনিষ্কাশনের মতো জরুরি সেবাগুলো পাওয়া সহজ হয়েছে। 
তবে ২০১৬ সাল থেকে দারিদ্র্য কমার গতি ধীর হয়েছে। ২০২০ সালে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে দারিদ্র্য বিমোচনে বিশ্বের আদর্শ দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরেছিল। 

দারিদ্র্যের মূল কারণ 
দারিদ্র্য চক্রের মূল কারণ সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ যথেষ্ট পরিমাণে না হওয়া। এ কারণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। বরং অতিমারি করোনার অভিঘাতে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। বেকারত্ব বাড়ছে; যা দারিদ্রের প্রধান উৎস। রপ্তানি আয়ে গতি কমেছে। অর্থনীতির ধীরগতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে দারিদ্র্য ও বৈষম্য পরিস্থিতির ওপর। এ ছাড়া অসহনীয় উচ্চ মূল্যস্ফীতি। বাজারে পণ্য ও সেবার মূল্য যেহারে বাড়ে, সে হারে মজুরি বাড়ে না। এ কারণে ২০২২ সাল থেকে দেশে দারিদ্র্য বাড়ছেই।
 

আরও পড়ুন

×