জবিতে আবারও গরুভোজ, উঠেছে প্রশ্ন
ফাইল ছবি
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০১:২৮
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ শনিবার গরুভোজ ও কাওয়ালি সন্ধ্যা হয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিসের বিশ্ববিদ্যালয় শাখা এ আয়োজন করে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার সময় পর পর দুই দিন গরুভোজের আয়োজনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিক্ষক ও ছাত্রনেতারা।
আগের দিন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) গরুভোজের আয়োজন করে। জকসুতে ইসলামী ছাত্রশিবির সংখ্যাগরিষ্ঠ। এ কারণে বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। অনেকের দাবি, এই আয়োজনের নেপথ্যে ছিল শিবির।
আজ ‘সম্প্রীতি ভোজ ও কাওয়ালি সন্ধ্যা ২০২৬’ কর্মসূচি পালিত হয়। আয়োজকেরা জানান, বিকেল সাড়ে তিনটা থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে খাবার বিতরণ করা হয়। সন্ধ্যার পর চত্বরে কাওয়ালির আসর বসে। শান্তিপূর্ণভাবেই কর্মসূচি সম্পন্ন হয়।
এর আগে সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন ও গণিত ভবনের মাঝের সড়কে গরু জবাই করেন আয়োজকেরা। পরে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে খাবার বিতরণ করা হয়।
আয়োজকদের ভাষ্য, সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদাভাবে খাসির মাংসের ব্যবস্থা রাখা হয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে সম্প্রীতি বজায় রাখাই তাঁদের লক্ষ্য। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচিতে অংশ নিতে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক আজম খান বলেন, ‘আমরা প্রথমে অনুমতি দিতে চাইনি। তবে সংগঠনটির নেতা মামুনুর রশিদ উপাচার্যকে ফোন করে অনুরোধ করেছেন। পরে শর্তসাপেক্ষে অনুমতি দেওয়া হয়েছে।’
সম্প্রীতি নিয়ে ভিন্নমত
শারদীয় দুর্গাপূজার সময়ে এ ধরনের আয়োজন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে পারে কিনা, সে বিষয়ে ভিন্নমত জানিয়েছেন শিক্ষক ও ছাত্রনেতারা।
জবি শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব শামসুল আরেফিন বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসবের সময়ে এমন আয়োজন করার আগে তাঁদের নিরাপত্তা ও অনুভূতির বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্যাম্পাসে গরু জবাই না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। গরুর মাংস খেতে নিষেধ করা হয়নি। তাই অন্য সময়েও গরুভোজের আয়োজন করা যেত।
জবি শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি ইভান তাহসীভ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রথমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পশু জবাই নিষিদ্ধ করে। পরে আবার জানায়, পশু জবাইয়ে কোনো বাধা নেই। এতে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। একটি ধর্মীয় উৎসব চলাকালে এ ধরনের আয়োজন করে নিজেদের প্রশ্নের মুখে ফেলা হয়েছে। সম্প্রীতি রক্ষায় শিক্ষার্থীদের সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ থাকা দরকার ছিল। ব্যক্তিস্বাধীনতার বিষয়টি ব্যবহার করে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা সৃষ্টি করে রাজনীতি করা কাম্য নয়।
তবে এ আয়োজনকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, অতীতেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই, কোরবানি ও পূজা হয়েছে। তাই এ আয়োজন নিয়ে সাম্প্রদায়িক বিতর্ক তৈরির কারণ নেই বলে তিনি মনে করেন।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
গত ১২ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার বিভাগের শিক্ষার্থীদের গরুর মাংস দিয়ে খিচুড়ি রান্নার আয়োজনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা তৈরি হয়। মন্দিরসংলগ্ন এলাকায় রান্নার অস্থায়ী চুলা তৈরিতে ইট ব্যবহার নিয়ে কয়েকজন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী আপত্তি জানান। পরে আয়োজকেরা স্থান পরিবর্তন করে রান্নার ব্যবস্থা করেন।
এর পরদিন ক্যাম্পাসে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করে প্রক্টর দপ্তর। এ নিয়ে একদল শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রতিবাদ শুরু হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানায়, উত্তেজনা এড়াতে সাময়িকভাবে পশু জবাইয়ের আয়োজন না করার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। সব ধরনের আয়োজন নিষিদ্ধ করা প্রশাসনের উদ্দেশ্য ছিল না।
এই নির্দেশনা উপেক্ষা করে পরপর দুই দিন গরুভোজের আয়োজন করা হলো। সনাতন ধর্মাবলম্বী দুজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
- বিষয় :
- জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়