ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

মূল্যস্ফীতি করের মতো, যার ভার নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বেশি

সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফের এমডি

মূল্যস্ফীতি করের মতো, যার ভার  নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বেশি
×
×

মেসবাহুল হক, ব্যাংকক থেকে

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৭ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের চাপে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব দেশের রাজস্ব আয়ের গড়ে ১৪ শতাংশ এখন ঋণ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। কয়েক বছর আগেও এ হার ছিল ৮ শতাংশ। সুদের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এসব দেশের সরকারের ওপর আর্থিক চাপ কমছে না। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকরভাবে ঋণ পুনর্গঠনের পাশাপাশি নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেছেন, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ন্যায্য রাজস্বনীতি এবং সরকারি ব্যয়ের সঠিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি। পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নতুন প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগানোর পাশাপাশি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।

গতকাল শনিবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলনের ষষ্ঠ দিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এতে সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদান উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন আইএমএফের যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক জুলি কোজাক।

ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে। মূল্যস্ফীতি অনেকটা করের মতো কাজ করে, যার প্রভাব নিম্ন আয়ের মানুষকে তুলনামূলক বেশি বহন করতে হয়। এ কারণে এমন অর্থনৈতিক পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে সরকারের নীতিতে স্পষ্টতা থাকবে এবং বেসরকারি খাত ও উদ্যোক্তারা সহজে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারবেন।

আইএমএফের এমডি বলেন, উচ্চ সুদ ও মূল্যস্ফীতির কারণে ঋণের বোঝা কমানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক নিম্ন আয়ের দেশ ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও নিজেদের আর্থিক অবস্থান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করলেও ঋণ পরিশোধের ব্যয় তাদের রাজস্বের বড় অংশ আটকে রাখছে। 

তাঁর মতে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত বাড়ছে। অন্যদিকে, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এ অনুপাত কিছুটা কমেছে। তবে সুদের হার বেশি থাকায় ঋণের অনুপাত কমার সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে সব নিম্ন আয়ের দেশকে বড় ধরনের ব্যয় সংকোচন বা কঠোর অর্থনৈতিক সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে– এমন ধারণার বিরোধিতা করেন তিনি।

সহজ শর্তে ঋণ বাড়ানোর উদ্যোগ
নিম্ন আয়ের দেশগুলোর অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে আইএমএফ দারিদ্র্য হ্রাস ও প্রবৃদ্ধি সহায়তা তহবিলের আওতায় অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। এ তহবিল থেকে যোগ্য দেশগুলোকে তুলনামূলক সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হয়। 

জর্জিয়েভা জানান, নতুন সংস্কারের ফলে আগের তুলনায় সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার পরিমাণ তিন গুণেরও বেশি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে সক্ষমতা উন্নয়ন কার্যক্রমেও অতিরিক্ত অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ঋণ সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে আইএমএফের এমডি বলেন, যেসব দেশের ঋণ পুনর্গঠন প্রয়োজন, তাদের ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে জি২০-এর কমন ফ্রেমওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  জর্জিয়েভা বলেন, কিছু দেশের ঋণ দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হলেও তাৎক্ষণিক অর্থের ঘাটতি থাকে। এসব দেশের নিজস্ব রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সহায়তা করার পাশাপাশি সমন্বিত আন্তর্জাতিক অর্থায়নের মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে নিম্ন আয়ের দেশগুলো তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক সহায়তায় তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

ব্যাংকবহির্ভূত লেনদেনে ঝুঁকি
গতকাল ‘ফিউচার অব ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট’ শীর্ষক আইএমএফের এক সেমিনারে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতের দ্রুত পরিবর্তন ও নতুন ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করা হয়। এতে বলা হয়, ডিজিটালাইজেশনের ফলে আর্থিক সেবা ও লেনদেনের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আর্থিক ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বাড়ায় নতুন ধরনের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

গ্রিসের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ক্রিস্টিনা পাপাকনস্টান্টিনু বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সম্পর্কিত সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় সতর্কতা প্রয়োজন। আর্থিক খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকদের চাহিদা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

আইএমএফের উপপরিচালক মিকেলা এরবেনোভা বলেন, ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার সঙ্গে নতুন ধরনের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। আর্থিক ব্যবস্থার আন্তঃসংযোগ এবং ডিজিটালাইজেশনের কারণে সম্ভাব্য সংকট আগে থেকে শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

সেমিনারে আর্থিক খাতের বর্তমান নিয়ন্ত্রক কাঠামো, রিপোর্টিং ব্যবস্থা ও মূলধন-সংক্রান্ত মানদণ্ড নতুন ঝুঁকি মোকাবিলায় যথেষ্ট কিনা, তা পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়। আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের পাশাপাশি প্রতিটি দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি ও গ্রহণক্ষমতার পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় মডুলার পদ্ধতিতে প্রয়োজন অনুযায়ী গভীর মূল্যায়ন, বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে আরও স্বচ্ছতা, যোগাযোগ ও সক্ষমতা উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা এবং প্রক্রিয়া ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। 

আরও পড়ুন

×