ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

সাংবাদিক গ্রেপ্তারে বিচারিক অনুমোদন চায় সম্পাদক পরিষদ

প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনে ১২ দফা সুপারিশ

সাংবাদিক গ্রেপ্তারে বিচারিক অনুমোদন চায় সম্পাদক পরিষদ
×
×

ছবি-সংগৃহীত

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ২১:২৫

প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এ স্বাধীন সাংবাদিকতা, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ ও বৈধ মতপ্রকাশের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। সাংবাদিকের পেশাগত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগে গ্রেপ্তার, তল্লাশি, জব্দ, ডিজিটাল তথ্য-উপাত্তে প্রবেশ ও নজরদারির মতো ব্যবস্থা নেওয়ার আগে আদালতের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।

একই সঙ্গে সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত অভিযোগের ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট ও নির্বাহী ক্ষমতার ব্যবহার বন্ধ, মানহানির অভিযোগ প্রেস কাউন্সিলে পাঠানো, তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা রক্ষা এবং কনটেন্ট অপসারণ ও ব্লক করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করার প্রস্তাব দিয়েছে সম্পাদক পরিষদ।

প্রস্তাবিত আইন সংশোধন ও চূড়ান্তকরণের লক্ষ্যে ১২ দফা সুপারিশে এসব কথা জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। সংগঠনটির মতে, সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি স্বাধীন সাংবাদিকতা, দায়িত্বশীল মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের পেশাগত স্বাধীনতা সুরক্ষায় আইনে সুস্পষ্ট বিধান থাকতে হবে।

সম্পাদক পরিষদ বলেছে, জনস্বার্থে প্রকাশিত সংবাদ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ ও মতামতকে শুধু বিষয়বস্তু বা সমালোচনামূলক অবস্থানের কারণে সাইবার অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। ন্যায্য সমালোচনা, রাজনৈতিক বক্তব্য, রম্য, কার্টুন, প্যারোডি ও ভোক্তার অভিযোগের মতো বৈধ মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেও আইনি সুরক্ষা থাকতে হবে। অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য কাউকে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করা যাবে না। মতপ্রকাশ-সংশ্লিষ্ট অপরাধকে অজামিনযোগ্য না করারও সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।

ভুল তথ্য, অপতথ্য ও গুজবের পৃথক সংজ্ঞা নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সম্পাদক পরিষদ বলেছে, কোনো তথ্য শুধু অযাচাইকৃত বা অসমর্থিত হওয়ার কারণে তাকে অপরাধের উপাদান হিসেবে গণ্য করা যাবে না। একই সঙ্গে বুলিং, মানহানি, হেয়প্রতিপন্ন করা, রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর বক্তব্য, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ক্ষুণ্ণ করা, যৌন হয়রানি ও সেক্সটর্শনের মতো বিষয়েরও সুস্পষ্ট সংজ্ঞা থাকতে হবে।

দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম, পরিবেশগত ক্ষতি, জনস্বাস্থ্য, ভোক্তার অধিকার, সরকারি ব্যয় এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নিয়ে সংবাদ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে জনস্বার্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দিয়েছে সম্পাদক পরিষদ।

সরকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি বা সরকারি নীতির সমালোচনা, রাজনৈতিক মতামত, বিশ্লেষণ, ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপাত্মক বক্তব্যকে সাইবার অপরাধ হিসেবে গণ্য না করার সুপারিশও করেছে সংগঠনটি। 'রাষ্ট্রকে হেয়প্রতিপন্ন করা'র মতো অস্পষ্ট শব্দবন্ধ বাদ দিয়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মতো বিষয়গুলোর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছে তারা। সাংবাদিকতা, গবেষণা, মানবাধিকারবিষয়ক পর্যবেক্ষণ ও জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশকে এসব অপরাধের সঙ্গে যুক্ত না করারও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি, লিখিত কারণ এবং প্রয়োজনীয়তার ব্যাখ্যা দেওয়ার সুপারিশ করেছে সম্পাদক পরিষদ। জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। প্রতিটি আদেশের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্বাধীন কর্তৃপক্ষ বা আদালতে আপিল ও বিচারিক পর্যালোচনার ব্যবস্থা রাখতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে কনটেন্ট ব্লক করা হলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আদালতের অনুমোদন বা পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি এ-সংক্রান্ত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।

মানহানির অভিযোগে নতুন ও অধিকতর কঠোর সাইবার অপরাধের বিধান না করে বিদ্যমান কাঠামোর আওতায় প্রেস কাউন্সিলে পাঠানোর সুপারিশ করেছে সম্পাদক পরিষদ। সংবাদ প্রকাশ, মতপ্রকাশ, মানহানি বা সাংবাদিকতার বিষয়বস্তু-সংক্রান্ত অভিযোগের বিচার মোবাইল কোর্ট বা নির্বাহী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে না করার প্রস্তাবও দিয়েছে তারা।

কোনো প্রতিবেদন বা প্রকাশনার কারণে পুরো সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রম বন্ধ, নিবন্ধন বাতিল কিংবা প্রতিষ্ঠানকে অযৌক্তিক শাস্তির মুখে না ফেলার সুপারিশ করেছে সম্পাদক পরিষদ। এ ধরনের বিষয় প্রেস কাউন্সিলের ওপর ন্যস্ত করার কথা বলেছে সংগঠনটি। পাশাপাশি সাংবাদিকের তথ্যসূত্রের পরিচয় প্রকাশে বাধ্য না করা এবং সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যম-সংক্রান্ত পেশাগত বিরোধে সরাসরি ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে, অভিযোগের প্রকৃতি অনুযায়ী, প্রথমে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের অভিযোগ ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়া কার্যকর করার প্রস্তাব দিয়েছে।

প্রেস কাউন্সিলের এখতিয়ার ও কার্যকারিতা আধুনিকায়নের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সম্পাদক পরিষদ, যাতে সংবাদপত্রের পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমও এর আওতায় আসে।

এ ছাড়া জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলকে বহুপক্ষীয় ও স্বাধীন তদারকির উপযোগী করার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি। সাইবার আইনের অধীনে তদন্ত, গ্রেপ্তার, তল্লাশি, জব্দ, নজরদারি ও কনটেন্ট অপসারণের ক্ষমতা প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ডের ওপর কার্যকর স্বাধীন তদারকি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। কাউন্সিলে সাইবার নিরাপত্তা, আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সম্পাদকীয় নেতৃত্বের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি এবং কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশও রয়েছে।

সম্পাদক পরিষদের মতে, সাইবার নিরাপত্তা, সাইবার অপরাধ ও ডিজিটাল পরিসরে সাংবাদিকতা পৃথক বিষয়। প্রস্তাবিত আইনে এসব বিষয়ের সীমারেখা অনেক ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নয়, যা স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার জন্য অন্তরায় হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত বিবেচনায় নিয়ে আইনটি পুনর্বিবেচনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

সম্পাদক পরিষদ বলেছে, স্বচ্ছতা, বিচারিক তদারকি, জবাবদিহি ও কার্যকর প্রতিকারের নিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই ভারসাম্যপূর্ণ ও জনবান্ধব সাইবার আইন প্রতিষ্ঠা সম্ভব। সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধ মোকাবিলার পাশাপাশি স্বাধীন সাংবাদিকতা, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ ও বৈধ মতপ্রকাশের পরিসরও সুরক্ষিত রাখতে হবে। নিরাপদ ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্বাধীন গণমাধ্যম পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়; সঠিক আইন ও যথাযথ সুরক্ষার মাধ্যমে দুটিকেই শক্তিশালী করা সম্ভব বলে মনে করে সম্পাদক পরিষদ।

আরও পড়ুন

×