হাসপাতাল নয়, রোগ প্রতিরোধে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী
অ্যামচ্যামের গোলটেবিল বৈঠকে কথা বলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১৩:২০ | আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১৩:২১
হাসপাতাল ও শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে রোগ প্রতিরোধ, শারীরিক অক্ষমতা হ্রাস এবং অকালমৃত্যু ঠেকানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে চায় সরকার। এজন্য প্রচলিত হাসপাতালকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো থেকে বেরিয়ে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের আধুনিক প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট অব থিংসের (আইওটি) সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি চিকিৎসা সরঞ্জামের কার্যকারিতা তদারকিতে জাতীয় ই-হেলথ ও ডিজিটাল মনিটরিং ড্যাশবোর্ড চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
আজ সোমবার সকালে রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচ্যাম) আয়োজিত ‘স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে চিকিৎসা প্রযুক্তির সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রকৃতপক্ষে স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রাথমিক ব্যর্থতা নির্দেশ করে। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই—আমি স্বাস্থ্যের প্রতিমন্ত্রী, হাসপাতালের প্রতিমন্ত্রী নই। আমাদের মূল অগ্রাধিকার হাসপাতাল বৃদ্ধি নয়, বরং তৃণমূল পর্যায় থেকে রোগ, শারীরিক অক্ষমতা ও অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা।’
স্বাস্থ্যসেবার প্রচলিত কাঠামো পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ডা. এম এ মুহিত বলেন, তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেট অব থিংসের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। সরকার এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়া নয়, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়ে দক্ষ করে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
দেশে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক রাখলে চলবে না। রোগীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় ছুটে আসার প্রয়োজন কমাতে বিভাগীয় পর্যায়ে এসব সেবা বিকেন্দ্রীকরণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ পর্যায়েও এ ধরনের সেবা সম্প্রসারণ করা হবে।
চিকিৎসা প্রযুক্তির সহজলভ্যতা বাড়াতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারের প্রথম বাজেটে হার্টের রিং বা স্টেন্ট, ডায়ালিসিস ফিল্টার, সক্রিয় ওষুধ উপাদান (এপিআই) এবং কৃত্রিম চোখের লেন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা উপকরণের ভ্যাট ও শুল্ক কমানো বা মওকুফ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানির অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা কমানোর কথাও বলেন প্রতিমন্ত্রী। তার ভাষ্য, অতীতে যে কমিটির বৈঠক দুই বছরেও হতো না, গত পাঁচ মাসে সেই কমিটি তিনবার বৈঠক করে চিকিৎসা সরঞ্জামের অনুমোদন নিশ্চিত করেছে।
বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু উচ্চমূল্যের চিকিৎসা সরঞ্জাম বিক্রি করলেই হবে না। এসব যন্ত্রপাতির জীবনকালীন ব্যয়, বিক্রয়োত্তর সেবা এবং স্থানীয় প্রকৌশলী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীদের চিকিৎসা প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশে চিকিৎসা সরঞ্জামের যন্ত্রাংশ সংযোজন এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ জনবল তৈরি হবে এবং চিকিৎসা প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়বে।
সরকারি হাসপাতালে অকেজো হয়ে পড়ে থাকা চিকিৎসা সরঞ্জামের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী। এসব যন্ত্রপাতির অবস্থা ও ব্যবহার নিয়মিত তদারকিতে জাতীয় ই-হেলথ ও ডিজিটাল মনিটরিং ড্যাশবোর্ড চালুর পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
এ ছাড়া সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান ডা. এম এ মুহিত। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী শিশুদের চিকিৎসা সহায়তায় এসব প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর হোসেন, অ্যামচ্যামের সভাপতি ও মাস্টারকার্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল, ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের বাণিজ্যিক কাউন্সেলর পল জি ফ্রস্ট এবং মেডট্রনিক পিএলসি ও ইন্টেল করপোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান ডা. ওমর ইশরাক।
আলোচনায় অংশ নেন মেডট্রনিক বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মায়াঙ্ক ত্রিপাঠী, জিই হেলথকেয়ার বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড ও ডিরেক্টর মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান (রোমেল), বেকটন ডিকিনসনের বাংলাদেশ বিজনেস লিডার মির্জা সজীব রায়হান এবং অ্যামচ্যামের স্বাস্থ্যসেবা উপকমিটির ইনচার্জ ডিরেক্টর ও ন্যাটকো বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আল-মামুন এম রাসেল।
- বিষয় :
- হাসপাতাল