ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

বিহঙ্গ

বিলুপ্তির দ্বারে রাজধনেশ

বিলুপ্তির দ্বারে রাজধনেশ
×
×

মহাবিপন্ন প্রাণী ‘রাজধনেশ’ (ছবি-লেখক)

ইনাম আল হক

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪৩ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

এক দশক ধরে বান্দরবান শহরে যে পাখির মূর্তিটি দর্পভরে দাঁড়িয়ে আছে, তার নাম ‘রাজধনেশ’। জায়গাটি ‘ধনেশ চত্বর’ নামেই পরিচিত। তাই ধারণা করা যায়, এই কংক্রিটের মূর্তি যে ধনেশ পাখির তা লোকের জানা আছে। তবে অনেকের হয়তো জানা নেই যে বাংলাদেশে মহাবিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে এ পাখির নাম। টিকিয়ে রাখার বড় উদ্যোগ না নিলে এ দেশের ক্ষুদ্র ও ক্ষীয়মাণ পাহাড়ি-বন থেকে এ পাখি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। 

এককালে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের বহু বনে রাজধনেশের সরব উপস্থিতি ছিল। দল বেঁধে ওরা বুনোফলের অতিকায় বৃক্ষে উড়ে আসত। ওদের ডানা ঝাপটানোর জোরালো আওয়াজ দূর থেকে শোনা যেত। তা শুনেই তীর-ধনুক অথবা বন্দুক নিয়ে ছুটে যেত শিকারিরা। সাদাকালো পালকের বিশাল ও দর্শনীয় দেহ নিয়ে রাজধনেশ পাখির পক্ষে শিকারির নজর এড়িয়ে যাওয়াটা সহজ নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সফল শিকারি হাসিমুখে ঘরে ফিরতেন। 

ডানা মেলে উড়ছে রাজধনেশ

পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি মানুষের গৃহে আজও সাজানো আছে বংশপরম্পরায় শিকার করা রাজধনেশের চঞ্চু। সেকালে তিন কেজি মাংস সংগ্রহ করা রাজধনেশ শিকারের মূল লক্ষ্য ছিল; এই সোনালি চঞ্চু একটি উপরিলাভ মাত্র। সম্প্রতি শৌখিন সংগ্রাহকের কাছে সুদর্শন চঞ্চু বিক্রি করাও ধনেশ শিকারের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। পোষা পাখির বাজারে বিক্রির জন্য গাছের কোটর থেকে ছানা চুরি করাও রাজধনেশ পাখি নিপাতের বড় কারণ। তবে প্রাচীন বৃক্ষ কেটে পাহাড়ি বন ফোকলা করে ফেলাই বাংলাদেশে এ পাখির টিকে থাকার পথে বৃহত্তম অন্তরায়। 

রাজধনেশসহ চার প্রজাতির ধনেশ পাখি আজও টিকে আছে বাংলাদেশে; যদিও বিশ্বের পাঁচ মহাদেশে একটি ধনেশ পাখিরও অস্তিত্ব নেই। বিশ্বের ৬২ প্রজাতির ধনেশ পাখির সবাই এশিয়া ও আফ্রিকার বৃষ্টিবনে বাস করে। রাজধনেশ পাখির নিবাস তো আরও সীমিত: দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি পাহাড়ি বনে তা সীমাবদ্ধ। 

আকৃতি, ওজন, চঞ্চুর বাহার, আয়ুষ্কাল, জীবনধারা ও বৃক্ষরোপণে রাজধনেশ বিশ্বে অনন্য। এ পাখি ৫০ বছর বেঁচে থাকে এবং পাঁচ বছর বয়স থেকে জোড়া বেঁধে জীবন কাটায়। ডিম ও ছানা নিয়ে মেয়েটি দেড় মাস গাছের বদ্ধ কোটরে বসে থাকে; আর ছেলেটি সারাদিন আহার্য সংগ্রহ করে এবং হোম ডেলিভারি দেয়। এ পাখির ইংরেজি নাম ‘গ্রেট হর্নবিল’ নিঃসন্দেহে যথার্থ ও অত্যন্ত উপযুক্ত। 

বন সৃষ্টি করাই রাজধনেশ পাখি-জীবনের মহত্তম সাধনা। বৃক্ষ রোপণ করে বন সম্প্রসারণ করার কাজে এমন দক্ষ পাখি আর নেই। ফলখোর হলেও এরা বীজখোর নয়; ৯৮% বীজই বনতলে ফেলে যায় এ পাখি। গবেষকরা বলেছেন, রাজধনেশদের বীজ ছড়ানোর পরিধি ১৩ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে এবং এরা প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রতিদিন ১২ হাজার বীজ ছড়াতে পারে। 

তবে দীর্ঘজীবনে একটি রাজধনেশের লাগানো বুনোগাছের সংখ্যা যত বড় হোক না কেন, তার চেয়ে অনেক বেশি গাছ আমরা ধরাশায়ী করে থাকি। আজও কাটা গাছের খড়ি দিয়ে রান্না হয় বাংলাদেশের ৪৬% বাড়িতে। তাই এরই মধ্যে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে অনেক স্থানের নাম হয়েছে ‘ন্যাড়া পাহাড়’ অথবা ‘ভূমিধসপ্রবণ এলাকা’। আমরা গৃহপালিত বৃক্ষ রোপণ করে দেশ ভরে ফেললেও প্রাকৃতিক বন ফিরিয়ে আনতে পারব না। সে কাজটি রাজধনেশই আমাদের চেয়ে ভালোভাবে করতে পারে। 

লেখক: পাখি বিশেষজ্ঞ, অভিযাত্রী ও আলোকচিত্রী

আরও পড়ুন

×