জাপান-বাংলাদেশ আলোচনায় তৃতীয় দেশের প্রসঙ্গ ছিল না: হুমায়ুন কবির
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চার দিনের জাপান সফর শেষে গতকাল ঢাকায় ফেরেন পিআইডি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫০ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট (বিগ-বি) নিয়ে আলোচনায় তৃতীয় কোনো দেশকে যুক্ত করার প্রসঙ্গ ওঠেনি বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, বিগ-বি নিয়ে আলোচনা বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
প্রধানমন্ত্রী চার দিনের জাপান সফর শেষে গতকাল শুক্রবার ভোরে দেশে ফেরেন। দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে বিগ-বি উদ্যোগের আওতায় ভারত, নেপাল ও ভুটানকে যুক্ত করে বৃহত্তর শিল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে কিনা– জানতে চান এক সাংবাদিক।
জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, জাপান সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশ শুরু থেকেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বিশেষ করে অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতেও তৃতীয় কোনো দেশের উল্লেখ নেই।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, অন্য কোনো দেশকে নিয়ে আলোচনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিনিধিদেরও আলোচনায় থাকতে হবে। তাদের সঙ্গে বসে এ ধরনের বিষয়ে আলোচনা করতে হবে। জাপানের সঙ্গে এবারের আলোচনায় তৃতীয় কোনো দেশকে যুক্ত করার প্রসঙ্গ আসেনি।
বিগ-বি নিয়ে যৌথ বিবৃতির অবস্থান তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সেখানে উদ্যোগটিকে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের বাইরে অন্য কোনো দেশকে নিয়ে আলোচনা হয়নি।
বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা ও সমুদ্রপথ নিয়ে জাপানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে কিনা– জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের কোনো আলোচনা হয়নি। এ বিষয়ে আলোচনা করতে হলে সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের উপস্থিতি প্রয়োজন।
বিগ-বি ও মাতারবাড়ী নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের বৃহত্তম ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। দলটির কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ ও বক্তব্য প্রত্যাশা করেন তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, যৌথ বিবৃতি পড়লেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। না দেখে, না বুঝে বা না পড়ে দেশ বিক্রি হয়ে যাওয়ার মতো মন্তব্য করা ঠিক নয়।
জাপানের সঙ্গে পাঁচ বছরে ৬৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি এবং ঋণের সুদের হার নিয়ে প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন আর আগের মতো ঋণ, অনুদান ও আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। বরং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রকৃত বিনিয়োগ অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ১৫ থেকে ২০ বছর আগে বাংলাদেশ ঋণ, সহজ শর্তের ঋণ ও আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন সেই অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে ব্যবসা ও বিনিয়োগের সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। এ ক্ষেত্রে কোনো পক্ষই অন্য পক্ষের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না।
জাপানের ঋণের সুদের হার প্রায় ৩ শতাংশে পৌঁছানোর বিষয়টি উল্লেখ করে এক সাংবাদিক জানতে চান, বহুপক্ষীয় ঋণদাতা সংস্থাগুলোর তুলনায় বেশি সুদে জাপানের ঋণ নেওয়া হবে কিনা? জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, ৬৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির বড় অংশই বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ। কোন বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য উপযোগী, তা আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নের বিকল্পগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে– এমন বিনিয়োগই গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি। বিনিয়োগ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।
জাপান সফরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনার বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সব পর্যায়েই এ বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবে সরকার।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ জাপানের সহযোগিতা চেয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাপান সহযোগিতা করবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ। তবে সংকটের মূল সমাধান মিয়ানমারের হাতে। দেশটিকে আলোচনায় আসতে হবে এবং সংকট নিরসনে উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের একার পক্ষে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরকে অত্যন্ত কার্যকর ও ফলপ্রসূ হিসেবে উল্লেখ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, সরকারি পর্যায়ের চুক্তির বাইরে জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশনে (জেট্রো) দুই দেশের বেসরকারি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
২৬ অক্টোবর সরকারি সফরে জাপানে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সফরকালে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ছয়টি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা দলিল স্বাক্ষর হয়েছে। পাশাপাশি ৪৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা প্রায় ২৯ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের দুটি ঋণ প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এসব চুক্তির মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে একটি টহল জাহাজ সংগ্রহের জন্য ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা ১ কোটি ৩৪ লাখ ৪০ হাজার ডলার অনুদান সহায়তার চুক্তিও রয়েছে।
বিলম্ব হলেও সবাইকে নিয়েই ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী
বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাপান থেকে ফিরতে দেরি হলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সফরসঙ্গী সবাইকে নিয়েই দেশে ফিরেছেন। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, ‘জাপান থেকে ফেরার আগে বিমানে সামান্য ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী চাইলে অন্য কোনো বিমানে দেশে ফিরতে পারতেন। কিন্তু সবাইকে সেখানে ফেলে তিনি সেটি করতে চাননি। ওই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী বিমানের অন্য যাত্রীদের কাছে গিয়ে কথা বলেছেন, তাদের আশ্বস্ত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে নিয়েই দেশে ফিরেছেন।’
জাপানে চার দিনের সরকারি সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমান এবং সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টা ৪৮ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
পরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব বলেন, ‘জাপান থেকে বিমান ছাড়ার আগে পর্যবেক্ষণের সময় সামান্য যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা যায়। এটি বড় কোনো সমস্যা ছিল না। পরে সফটওয়্যার দিয়ে দ্রুত সেটির সমাধান করা হয়।’
এ সময় ডা. জোবাইদা রহমান শিশুদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেন বলে জানান আতিকুর রহমান রুমন। চার দিনের সফর শেষে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়। কারিগরি ত্রুটির জন্য ফ্লাইটে প্রায় ৫ ঘণ্টা বিলম্ব হয়।
ফ্লাইটে কারিগরি ত্রুটির কারণ খুঁজতে তদন্ত কমিটি
প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমানের ফ্লাইটে কারিগরি ত্রুটির কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিমানের গঠন করা এ কমিটিকে চার কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ) এয়ার কমডোর এম নিয়ামুল কবীর স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।
অফিস আদেশ অনুযায়ী, তদন্ত কমিটির সভাপতি বিমানের চিফ (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিউলিং)। সদস্য সচিব ব্যবস্থাপক (আইনবিষয়ক)। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন চিফ ইঞ্জিনিয়ার (ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোডাকশন) ও ডেপুটি চিফ (ফ্লাইট সেফটি)।
প্রয়োজনে বিমানের যে কোনো কর্মকর্তাকে কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। কমিটিকে ফ্লাইটটির (বিজি ৩৭৭) কারিগরি ত্রুটির প্রকৃত কারণ ও ধরন উদ্ঘাটন করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ত্রুটি শনাক্তকরণ, নিরসন ও পরবর্তী সময়ে উড়োজাহাজটির উড্ডয়ন উপযোগিতা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে নেওয়া পদক্ষেপ পর্যালোচনা করবে কমিটি।
তদন্তের আওতায় আরও থাকবে কারিগরি ত্রুটির কারণে ফ্লাইট বিলম্ব, যাত্রীদের ভোগান্তি ও বিমানের প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তির ওপর সৃষ্ট প্রভাব নিরূপণ। এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের দায়িত্ব-কর্তব্য পর্যালোচনা করবে কমিটি। কারও কোনো পর্যায়ে দায়িত্বে অবহেলা, সমন্বয়হীনতা কিংবা প্রক্রিয়াগত ত্রুটি ছিল কিনা, তা যাচাই করে দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে কমিটিকে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশও দেবে কমিটি।
- বিষয় :
- প্রধানমন্ত্রী
- জাপান