প্রাকৃতিক কৃষিতে অবদানের জন্য সম্মাননা পেলেন কৃষক, উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠান
কৃষি ঐতিহ্য ধরে রাখতে উদ্বোধন করা হলো কৃষি জাদুঘর
ছবি: সমকাল
জাহিদুর রহমান, বেড়া (পাবনা) থেকে
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:০৩ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮:২৯
নিজের জমিতে ঘাস চাষ করেন সানোয়ার হোসেন। সেই ঘাস খায় তার খামারের গরু। গরুর গোবর থেকে তৈরি হয় বায়োগ্যাস, যা দিয়ে চলে রান্নার কাজ। বায়োগ্যাস তৈরির পর অবশিষ্টাংশ দিয়ে তৈরি করেন জৈব সার। সেই সার ব্যবহার করেন জমিতে। আবার জমিতে উৎপাদিত ফসলের একটি অংশ কাজে লাগে খামারের বিভিন্ন কাজে। এভাবেই কৃষির একটি চক্র গড়ে তুলেছেন তিনি। এতে কমেছে উৎপাদন খরচ, গড়ে উঠেছে পরিবেশবান্ধব কৃষিব্যবস্থা।
টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার মহিষমারা গ্রামের সানোয়ার হোসেনের এই খামারের নাম ‘সানোয়ার অ্যাগ্রো ফার্ম’। একসময় হাইস্কুলে ইংরেজি পড়াতেন তিনি। শিক্ষকতা ছেড়ে কৃষিকাজে যুক্ত হয়ে গড়ে তুলেছেন বৈচিত্র্যময় এই খামার। এখানে কফি, আনারস, পেয়ারা, কলা ও ড্রাগন ফলসহ প্রায় ২৭ ধরনের ফসল চাষ করেন। রয়েছে গরু ও মাছের খামারও। নিজের তৈরি জৈব সার ও বালাইনাশক ব্যবহার করে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করেন তিনি।
কৃষিকাজের এই অভিজ্ঞতা ও অবদানের স্বীকৃতি পেয়েছেন সানোয়ার। শনিবার পাবনার বেড়া উপজেলার আমিনপুর থানার দয়ালনগরে আয়োজিত ‘প্রাকৃতিক কৃষি সম্মাননা ১৪৩৩’ অনুষ্ঠানে বর্ষসেরা প্রাকৃতিক কৃষক নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। একই অনুষ্ঠানে প্রাকৃতিক কৃষিতে অবদানের জন্য বিভিন্ন শ্রেণিতে কৃষক, কৃষি উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা দেওয়া হয়।
কৃষকের শ্রম, অভিজ্ঞতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে তাদের নিবিড় সম্পর্ককে স্বীকৃতি দিতে বিকে ফাউন্ডেশন ও দয়ালনগর বাহারুন্নেছা পাবলিক লাইব্রেরি যৌথভাবে এ আয়োজন করে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশবান্ধব কৃষিচর্চায় অবদান রাখা কৃষকদের সামনে তুলে ধরাই ছিল উদ্যোগটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
মাটির সঙ্গে যাদের জীবনের গভীর সম্পর্ক, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে যারা ফসল ফলান, তাদের অনেকেই থেকে যান আড়ালে। অথচ তাদের শ্রমেই মানুষের ঘরে পৌঁছায় খাদ্য। প্রাকৃতিক কৃষির চর্চা ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে যুক্ত এসব কৃষকের কাজের সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি অন্যদেরও এ চর্চায় উৎসাহিত করতে আয়োজন করা হয় সম্মাননা অনুষ্ঠানের।
গতকাল শুক্রবার একই এলাকায় ‘মাটির গান’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পরদিন শনিবার সকালে দেওয়া হয় প্রাকৃতিক কৃষি সম্মাননা। এতে কৃষক, কৃষিবিদ, গবেষক, শিক্ষাবিদ, সরকারি কর্মকর্তা, উদ্যোক্তা ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।
দয়ালনগর বাহারুন্নেছা পাবলিক লাইব্রেরি প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন আয়োজক প্রতিষ্ঠান দুটির প্রতিষ্ঠাতা এম এ বাতেন খান। তিনি প্রাকৃতিক কৃষি, নিরাপদ খাদ্য ও কৃষকের কল্যাণে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
এম এ বাতেন খান বলেন, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় প্রাকৃতিক কৃষির গুরুত্ব বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ওপর নির্ভরশীল কৃষিব্যবস্থার কারণে মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে প্রাকৃতিক কৃষিচর্চায় যুক্ত কৃষকদের উৎসাহিত করা এবং তাদের কাজের সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি।
সম্মাননা পেলেন যারা
প্রাকৃতিক কৃষি সম্মাননায় তিনটি শ্রেণিতে কৃষক, কৃষি উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
বর্ষসেরা প্রাকৃতিক কৃষি প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত হয়েছে ‘কোলে কাপরা’। ৫৬ বিঘা জমিতে ১৫ বছর ধরে প্রাকৃতিক কৃষিচর্চার মাধ্যমে ৭৫টির বেশি ধরনের খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও বিপণন করছে প্রতিষ্ঠানটি। এ বিভাগে প্রথম রানারআপ হয়েছে মানিকগঞ্জের ‘চাষবাস’। স্থানীয় চুক্তিভিত্তিক কৃষকদের সংগঠিত করে প্রায় ১২ বছর ধরে প্রাকৃতিক চাষাবাদ ও পণ্য বিপণনে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
যৌথভাবে দ্বিতীয় রানারআপ হয়েছে ‘প্রযত্ন’ ও ‘দেশি ফার্ম’। বৃহত্তর টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও সিরাজগঞ্জে স্থানীয় ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর কৃষকদের নিয়ে প্রাকৃতিক কৃষিচর্চা এবং উৎপাদিত পণ্য বিপণনে কাজ করছে প্রযত্ন। অন্যদিকে পাবনার ঢালার চর অঞ্চলে দেশি গরু পালন, গোবর থেকে কম্পোস্ট তৈরি এবং স্থানীয় জাতের কলাসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ করছে দেশি ফার্ম।
বর্ষসেরা প্রাকৃতিক কৃষক হয়েছেন টাঙ্গাইলের মধুপুরের মোহাম্মদ সানোয়ার হোসেন। এ বিভাগে রানারআপ হয়েছেন রাজশাহীর পবার সুলতানা খাতুন। ২০১৪ সাল থেকে তিনি ২০০টির বেশি স্থানীয় জাতের শস্য চাষ ও বীজ সংরক্ষণ করছেন। তার পরিচালিত আটটি নারী সংগঠনের ২৪০ জন নারী কৃষক ও উদ্যোক্তা নিরাপদ কৃষি, বীজ সংরক্ষণ এবং শস্য বিনিময়ের কাজে যুক্ত।
যৌথভাবে দ্বিতীয় রানারআপ হয়েছেন পাবনার শাহাদুল ইসলাম ও চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের মোহাম্মদ আলী। শাহাদুল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক তৈরি করে আদি জাতের ধান, আখ, হলুদ, পেঁয়াজ, রসুন ও বিভিন্ন সবজি চাষ করেন। অন্যদিকে মোহাম্মদ আলী কম্পোস্ট ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে একই জমিতে একসঙ্গে ২২ ধরনের ফসল আবাদ করছেন। স্থানীয় বেগুনের জাত সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের পাশাপাশি আঙুর চাষেও কাজ করছেন তিনি।
আজীবন কৃষি সম্মাননা পেয়েছেন তিলোত্তমা অর্গানিক কৃষি খামারের কর্ণধার জোয়ারদার নওশের আলী। ২০১০ সাল থেকে তিনি নিজস্ব তত্ত্বাবধানে জৈব কৃষির মাধ্যমে পরিবারের খাবার উৎপাদন করছেন। পাশাপাশি ঢাকার বিভিন্ন বাজারে তার উৎপাদিত পণ্য সরবরাহ করছেন।
অনুষ্ঠানে আলোচকদের মধ্যে ছিলেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মো. শামীম, কৃষি মন্ত্রণালয়ের পার্টনার প্রকল্পের পরামর্শক ড. মো. মাহবুব আলম এবং পাবনা প্রেসক্লাবের সভাপতি আক্তারুজ্জামান আক্তার।
এতে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমি (নাটা), মহাপরিচালক মো. সাইফুল আজম খান, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এ এফ এম জামাল উদ্দিন, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা মামুনুর রহমান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের উচ্চতর ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা ও বিভাগীয় প্রধান মোহাম্মদ সাঈদুর রহমান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের পার্টনার প্রকল্পের পরামর্শক মো. মাহবুব আলম, চিত্ত মিডিয়ার স্বত্বাধিকারী জুয়েল রানা।
কৃষি ঐতিহ্য ধরে রাখতে জাদুঘর
প্রাকৃতিক কৃষি সম্মাননা অনুষ্ঠান শেষে উদ্বোধন করা হয় বিকে ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত কৃষি জাদুঘর। পাবনার বেড়া উপজেলার আমিনপুর থানার বাঁধের হাটে অবস্থিত এ জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে হারিয়ে যেতে বসা কৃষি ঐতিহ্যের নানা নিদর্শন।
বিকে ফাউন্ডেশনের কনসালটেন্ট মিজানুর রহমান বলেন, একসময় কৃষকের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ ও কৃষি সরঞ্জাম এখানে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব নিদর্শনের মাধ্যমে কৃষির বিবর্তন, গ্রামীণ জীবনযাপন এবং কৃষির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হবে।
তার ভাষ্য, জাদুঘরটি শুধু পুরোনো কৃষি সরঞ্জাম সংরক্ষণের স্থান নয়; বরং কৃষির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ও শেকড়ের ইতিহাস জানার একটি উদ্যোগ।