শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ায় তাহসিফকে হত্যা, সন্দেহ রাষ্ট্রপক্ষের
কে এম তাহসিফ সাউরি
আদালত প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ২৩:০০ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ২৩:০২
বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির লাশ উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আজ শনিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস শুনানি শেষে এই আদেশ দেন।
মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে নৌ পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন তাকে সাত দিনের রিমান্ডে চেয়ে আবেদন করেন। এদিন রিমান্ড শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুল হক দিদার বলেন, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ‘ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার’ কারণে তাহসিফকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
আবেদনে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে তদন্তে সন্দেহভাজন আসামি দীপ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দীপকে কারাগারে আটক রাখা একান্ত প্রয়োজন। তিনি তুরাগ থানার ১৮ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন।
আসামি জামিনে মুক্তি পেলে পালিয়ে যেতে পারে, তাতে তদন্তে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে তুলে ধরে রহস্য উদঘাটন এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তার করাসহ পাঁচ কারণ দেখিয়ে সাত দিনের রিমান্ডের আর্জি জানান তদন্ত কর্মকর্তা। এদিন দুপুর সোয়া ২টার দিকে আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। তাকে ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়।
বিকেল ৩টা ২৫ মিনিটের দিকে আসামিকে এজলাসে তোলা হয়। এ সময় হাতে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট ও শরীরে বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে দীপকে কাঠগড়ায় তোলা হয়। পরে হেলমেট, বুলেট প্রুফ জ্যাকেট খুলে ফেলা হয়। এরপর শুনানি শুরু হয়। তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর ফিরোজ উদ্দিন রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার ভিডিও করেছিলেন তাহসিফ সাউরি। পরবর্তীতে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছাড়া হয়। এ কারণে ভিকটিমকে খুন করা হতে পারেন। সে তথ্য উদঘাটনের জন্য, এ ঘটনার সাথে আর কারা জড়িত তা জানান জন্য আসামির রিমান্ড প্রয়োজন।
দীপের পক্ষে দুই আইনজীবী মনিরুল ইসলাম ও মুতাসিম বিল্লাহ রিমান্ড আবেদন বাতিল চেয়ে শুনানি করেন। প্রথমে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ভিকটিমের সঙ্গে আসামির পারিবারিকভাবে ৬ বছরের সম্পর্ক। ভিকটিমের বাবা কিন্তু একটি বারও বলেননি আসামি ঘটনার সঙ্গে জড়িত। আর ভিকটিম বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা। রাত ২টার দিকে তিনি কেন মাদক আস্তানায় যাবেন, তা বোধগম্য নয়।
তিনি আরও বলেন, ‘আসামি মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার। আমরাও চাই, সত্য উদঘাটন হোক। আসামি কিন্তু প্রথম থেকে সহযোগিতা করে আসছেন। এটা হত্যা না আত্মহত্যা, সন্দেহ হয়। আর ভিকটিমের শরীরে কিন্তু কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। তার পরিবার কিন্তু মামলা করতে চায়নি। আমরাও সত্য উদঘাটনের পক্ষে। এ কারণে জামিন আবেদন করিনি।
এরপর মুতাসিম বিল্লাহ বলেন, ‘আসামি ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। তিনি জড়িত থাকলে কিন্তু বাসায় থাকতেন না। প্রথম থেকে কিন্তু তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। আমরাও চাই, প্রকৃত রহস্য উঠে আনুক ‘ উভয় পক্ষের শুনানি শেষে দীপকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।
পরে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুল হক দিদার সাংবাদিকদের বলেন, দীপের বিরুদ্ধে তথ্য গোপন, অপরাধের আলামত নষ্ট করা বা অপরাধীকে শাস্তি থেকে বাঁচানো ও যৌথ দায়বদ্ধতা অভিযোগ আনা হয়েছে দণ্ডবিধির ২০৩, ২০১ ও ৩৪ ধারায়। তিনি বলেন, ‘যিনি হত্যা হয়েছেন, ভিকটিম হয়েছেন, স্বৈরাচার শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার সময় যে ভিডিওটা আপনারা দেখেছেন…শেখ হাসিনা পালিয়ে যাচ্ছেন, এই যে ভিডিওটা হয়েছে, উনি এই ভিডিওটা করেছিলেন এবং সোশাল মিডিয়াতে দিয়েছিলেন। যার কারণে ২০২৪ সালের এ আন্দোলন সফল হয়েছিল, এ কারণে হয়তো, আজকের এই ভিকটিমকে মারার পরিকল্পনা হয়েছে এবং তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন।
এদিকে রিমান্ডের আদেশ হওয়ার পর আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার সময় দীপ এক স্বজনকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমি ফুললি স্ট্রং।’ তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা না করার কথা বলেন দীপ।
এর আগে, দীপকে বৃহস্পতিবার রাতে মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পিবিআই। পরদিন শুক্রবার রাতে তাকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। শুক্রবার রাতে তাহসিফের বাবা মামলা করার পর দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
গত বুধবার বিকেলে তুরাগের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির ভাসমান লাশ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। তিনি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ‘দীপের ডাকে’ বাসার নিচে নামেন এবং নিজের বাইক নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন।
দীপ বৃহস্পতিবার বলেছিলেন, রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকা থেকে তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান। রাতেই মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পিবিআই। তার দেওয়া তথ্যেই শুক্রবার সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের বাইকটি উদ্ধার করা হয়। ‘মাদকস্পট’ হিসেবে পরিচিত ওই এলাকায় মধ্যরাতে তাহসিফের সঙ্গে যাওয়ার কথা স্বীকারও করে দীপ।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে রাজধানীর উত্তরখান থানায় শুক্রবার রাত ১টা ৫ মিনিটে মামলা করেন তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। পরে এ মামলায় দীপকে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।
- বিষয় :
- হত্যা
- বিমান বাহিনী