ঢাকা রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

ব্যবসায়ী-বিত্তশালীদের কাছে জিম্মি রাজনীতি, দলগুলোতে পরিবারতন্ত্রের দাপট

টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদন

ব্যবসায়ী-বিত্তশালীদের কাছে জিম্মি রাজনীতি, দলগুলোতে পরিবারতন্ত্রের দাপট
×
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ১৪:২৭ | আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ১৪:৩৩

দেশের অগ্রযাত্রায় বড় ভূমিকা থাকলেও গণতান্ত্রিক চর্চা ও সুশাসনের অভাবে রাজনৈতিক দলগুলো এখন অর্থ ও পেশীশক্তির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার চরম অভাবের কারণে রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র, ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব এবং পুরুষতান্ত্রিকতার গভীরতা ক্রমাগত বাড়ছে।

রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। গবেষণায় ৩২টি নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

আয়ের চেয়ে ব্যয় আকাশচুম্বী
টিআইবির গবেষণা অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলোর আয়ের আনুষ্ঠানিক উৎসের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম ও কার্যালয় পরিচালনার খরচের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান রয়েছে। দলগুলোর জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কার্যালয় ও ন্যূনতম সাংগঠনিক কাজ চালাতে বাৎসরিক যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপ্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিনির্ভর উৎস থেকে আসে।

হিসাব তুলে ধরে টিআইবি জানায়, ন্যূনতম নিবন্ধনের শর্ত হিসেবে একটি দলের যদি ২২টি জেলা ও ১০১টি উপজেলায় কার্যালয় ও রাজনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখতে হয়, তবে বাৎসরিক প্রায় ১৪ থেকে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। অথচ দলগুলোর ঘোষিত আয়ের উৎস বা সদস্যদের চাঁদা বাবদ সর্বোচ্চ আয় মাত্র ২৬ লাখ টাকা।

একইভাবে দেশের সব জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পর্যন্ত কাজের পরিধি বিস্তৃত থাকলে বাৎসরিক খরচ দাঁড়ায় ৩৩২ থেকে ৩৯৩ কোটি টাকা, যার বিপরীতে চাঁদা বাবদ সর্বোচ্চ আয় আসে ৩৮ কোটি টাকা। আর যেসব বড় দলের ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত সাংগঠনিক ব্যাপ্তি রয়েছে, তাদের বাৎসরিক খরচ ১,৫৩২ থেকে ২,১৮৮ কোটি টাকা। অথচ তাদের চাঁদা বাবদ বার্ষিক আয়ের সম্ভাবনা মাত্র ১১৬ কোটি টাকা।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘দলগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে যে আয়-ব্যয়ের হিসাব দেয়, বাস্তবতার সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। এই বিপুল অর্থের অনানুষ্ঠানিক ও ব্যক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার কারণে রাজনীতিতে বিত্তশালী ও ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া পৃষ্ঠপোষকতা তৈরি হচ্ছে, যা সুশাসনের পথে প্রধান অন্তরায়। রাজনীতিতে অর্থ ও পেশীশক্তির এমন ব্যবহার এক ধরনের স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে।’

তৃণমূল বঞ্চিত, নারীদের নামমাত্র উপস্থিতি
গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে প্রায় ১০টি প্রধান রাজনৈতিক দল পারিবারিক পর্যায় থেকে নেতৃত্বে আসছে, যার ফলে তৃণমূল থেকে শক্তিশালী ও যোগ্য নেতৃত্ব উঠে আসার পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দলগুলোতে পরিবারতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র এবং কর্তৃত্বপরায়ণতা জাঁকিয়ে বসেছে। ক্ষেত্রবিশেষে দল পরিচালনায় গঠনতন্ত্রের তোয়াক্কা না করে অ্যাডহক বা বিশেষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

আইনি বাধ্যবাধকতা ও রাজনৈতিক দলগুলোর আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও দলগুলোতে নারীদের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বাস্তব কোনো অগ্রগতি নেই। অধিকাংশ দলেই নারীদের অবস্থান নামমাত্র বা প্রতীকী হিসেবে রয়ে গেছে।

সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা
রাজনীতিতে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্বৃত্তায়নের কারণে দলগুলোর মধ্যে তীব্র কোন্দল ও সহিংসতা বাড়ছে। গত ৯ মাসের ডেটা উল্লেখ করে টিআইবি জানায়, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও অন্তর্কলহের কারণে বহু নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। ক্ষমতার এই সহিংস চর্চা শুধু জাতীয় পর্যায়েই নয়, বরং তৃণমূল বা স্থানীয় পর্যায়েও মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে।

আইনি কাঠামোর চরম ঘাটতি
টিআইবি জানায়, রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের জন্য একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী আইনি কাঠামোর অভাব রয়েছে। নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনগুলো অনেক ক্ষেত্রে অতি-নিয়ন্ত্রণমূলক এবং আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন।

উত্তরণের উপায় ও সুপারিশ
গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য বলে মনে করে টিআইবি। এ লক্ষ্যে সংস্থাটি ১২ দফা সুপারিশ পেশ করেছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান স্পষ্ট করে বলেন, এই রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মূল দায়িত্ব দলগুলোকেই নিতে হবে। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে দলগুলোকে নিজেদের আয়নার সামনে দাঁড় করাতে হবে এবং সংস্কারের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

আরও পড়ুন

×