ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন গ্যাসের অভাবে রান্না বন্ধ

সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন গ্যাসের অভাবে রান্না বন্ধ
×
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | ০৮:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

গ্যাসের অভাবে রান্না করতে পারেননি অনেক এলাকার বাসিন্দা। কোথাও চুলা জ্বলেছে টিপটিপ করে, কোথাও একেবারেই গ্যাস পাওয়া যায়নি। বাধ্য হয়ে অনেকে ইলেকট্রিক চুলায় রান্না করেছেন। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কোনো কোনোটি বন্ধ রাখতে হয়েছে। যেসব স্টেশনে গ্যাস পাওয়া গেছে, সেখানে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। গতকাল বুধবার ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহক, পরিবহন চালক ও শিল্পকারখানার মালিকরা।

কক্সবাজারের মহেশখালীতে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রাখায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমেছে ৪৩ কোটি ঘনফুট। এতে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রেও সরবরাহে টান পড়েছে।

রাজধানীর আজিমপুর, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, ধানমন্ডি, কলাবাগানসহ বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকেই গ্যাসের চাপ কম ছিল। মিরপুরের বাসিন্দা আকবর হোসেন বলেন, সকাল থেকে হঠাৎ গ্যাস পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে ইলেকট্রিক চুলায় রান্না করতে হয়েছে। মগবাজারের বাসিন্দা রাবেয়া আক্তার বলেন, বুধবার সকাল থেকে রান্না করা যাচ্ছে না। এখন ইলেকট্রিক চুলার ওপরই ভরসা করতে হবে।
সিএনজি স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। মহাখালী, তেজগাঁও, কল্যাণপুর, শ্যামলী, গাবতলী, মালিবাগ, খিলগাঁও, মুগদা, মতিঝিল, বনশ্রীসহ বিভিন্ন এলাকার স্টেশনে চাপ কম থাকায় যানবাহনকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কোনো কোনো স্টেশনে সরবরাহ বন্ধ থাকায় কার্যক্রমও বন্ধ রাখতে হয়েছে। এতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের চালকদের আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

গ্যাস সংকটের কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ চালকরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পের লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছেন না তারা। গতকাল দুপুরে রাজধানীর সাতরাস্তা মোড়ের একটি সিএনজি স্টেশনে কথা হয় চালক ইকবাল হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, দিনের বেশির ভাগ সময়ই চলে যাচ্ছে গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়ে। ফলে গাড়ি চালানোর সময় পাচ্ছি না, আয়ও কমে গেছে। 
সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর বলেন, সাধারণত সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে ১৫ পিএসআই চাপে গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে অনেক স্টেশনে গ্যাসের চাপ কমে মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআইয়ে নেমে এসেছে। এত কম চাপে স্টেশনগুলোর কম্প্রেসর পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। গ্যাসের সরবরাহ ও চাপ স্বাভাবিক না হলে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন।
ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলেও গ্যাসের স্বল্প চাপ ও সরবরাহ ঘাটতির খবর পাওয়া গেছে। বাসাবাড়িতে রান্নার কাজ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সিএনজি স্টেশন ও শিল্পকারখানায় সরবরাহ নিয়ে ভোগান্তি তৈরি হয়েছে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির অপারেশন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, মঙ্গলবার এলএনজি থেকে ৯৭ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেছে। বুধবার ৬০ কোটি ঘনফুট পাওয়ার কথা থাকলেও পাওয়া যাচ্ছে ৫১ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট। সামিটের টার্মিনাল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ থাকায় সরবরাহ কমেছে।
তিনি বলেন, তিতাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট। ঢাকা শহরে গ্যাসের বিল করা হয় প্রায় ১৬ কোটি ঘনফুটের। তবে অবৈধ সংযোগের কারণে প্রকৃত সরবরাহ এর চেয়ে বেশি হয়ে থাকে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৮টায় জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৫৪ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে ১৫৬ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট এবং আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে ৯৭ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। দুপুর ২টায় মোট সরবরাহ কমে দাঁড়ায় ২১১ কোটি ঘনফুটে। এ সময় দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও এলএনজি সরবরাহ কমে ৫৪ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে।

পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, সামিটের টার্মিনালে জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বুধবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে।
আমদানি করা এলএনজিকে আবার গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয় ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে। দেশে এ কাজের জন্য দুটি টার্মিনাল রয়েছে। এর মধ্যে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট পরিচালিত টার্মিনালের দৈনিক গ্যাস সরবরাহের ক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট। সামিটের টার্মিনালের ক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট। ফলে একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকলে আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যায়।

সরকারি হিসাবে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। তবে খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত চাহিদা ৫০০ থেকে ৫৫০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ থাকে গড়ে ২৫০ থেকে ২৬০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এমনিতেই কম। এর মধ্যে দুটি টার্মিনালের একটিতে সমস্যা দেখা দিলে সংকট আরও বেড়ে যায়।

শনিবার বিকেল পর্যন্ত সামিটের টার্মিনাল বন্ধ থাকবে। শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় এ দুই দিন গ্যাসের চাহিদা কিছুটা কম থাকতে পারে। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানায় সরবরাহ কম থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবাসিক গ্রাহকদেরও রান্নার কাজে ভোগান্তি পোহাতে হতে পারে।
এর আগেও এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বড় ধরনের গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছিল। গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেটের ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট কমে যায়। ২৪ জুলাই সরবরাহ নেমে আসে ২১৭ কোটি ঘনফুটে। এতে আবাসিক গ্রাহকদের রান্নার গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার পাশাপাশি শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়। পরে সামিটের টার্মিনাল থেকেও সরবরাহ বন্ধ হলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছিল।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, বারবার টার্মিনালে সমস্যা দেখা দেওয়ায় আমদানিনির্ভর গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হচ্ছে। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন না বাড়িয়ে শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করলে এ ধরনের সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। এ জন্য নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও বিদ্যমান কূপ থেকে উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর  দিতে হবে।

আরও পড়ুন

×