কুয়েটের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ড্রিম
হাত বাড়ালেই বন্ধু
নতুন শিক্ষার্থীরা ভর্তি হলে তাদের রক্তের গ্রুপের তথ্য সংগ্রহ করে ড্রিম
শাকিবুল হাসান
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৪৮
রাত তখন ২টা। মাত্র ১২ দিনের এক শিশুর জন্য জরুরি রক্তের প্রয়োজন। খুলনা শহরের একটি হাসপাতালে রক্ত দিতে হবে, কিন্তু এত রাতে ডোনার পাওয়া কঠিন। খবর পেয়ে কুয়েটের শিক্ষার্থী জাহিদ তাঁর জুনিয়র তারেক মনোয়ারকে নিয়ে ছুটে যান হাসপাতালে। রক্ত দেওয়ার পর শিশুটির স্বজনেরা কৃতজ্ঞতায় কান্না করে ফেলেন। ফেরার সময় তাদের হাতে ৫০০ টাকা তুলে দেন এবং পরে ফোন করেও কৃতজ্ঞতা জানান।
এমন অভিজ্ঞতা জাহিদের কাছে নতুন নয়। একবার রাত ৩টায় ও নেগেটিভ রক্তের প্রয়োজন হলে টানা চার ঘণ্টা চেষ্টা করেও ডোনার খুঁজে পাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত রক্তের ব্যবস্থা করতে না পারার কষ্ট আজও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
জাহিদের মতো অনেক শিক্ষার্থী যুক্ত খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ড্রিমের সঙ্গে। ‘ডোনেট ব্লাড, সেভ লাইফ’ স্লোগান নিয়ে ২০০৫ সালে যাত্রা শুরু করা সংগঠনটির বর্তমান স্বেচ্ছাসেবী প্রায় ১০০ জন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সংগঠনটির মাধ্যমে বছরে প্রায় ৬০০ থেকে ৮০০ ব্যাগ রক্ত সরবরাহ করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষার্থীরা ভর্তি হলে তাদের রক্তের গ্রুপের তথ্য সংগ্রহ করে ড্রিম। রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী ডোনারের সঙ্গে যোগাযোগ, হাসপাতালে যাতায়াতে সহযোগিতা এবং রোগীর স্বজনদের সঙ্গে সমন্বয় করেন স্বেচ্ছাসেবীরা। খুলনার বিভিন্ন হাসপাতাল থেকেও তাদের কাছে রক্তের জন্য যোগাযোগ করা হয়।
ড্রিমের এজিএস তাইফুর রহমানের কাছে নিয়মিত ফোন আসে। একদিন এক রক্তগ্রহীতার স্বজন ফোন করে জানান, যাঁর জন্য আগে রক্ত নেওয়া হতো, তিনি আর বেঁচে নেই। আবার থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত এক শিশুর জন্য নিয়মিত রক্তের ব্যবস্থা করতে গিয়ে তার পরিবারের সঙ্গে গড়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। তাইফুর বলেন, মানুষের ভালোবাসা ও উপকার করতে পারার অনুভূতিই তাঁকে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত রেখেছে। ড্রিমের সদস্যরা নিজেরাও নিয়মিত রক্ত দেন। আব্দুল্লাহ শেখ চারবার, মুশফিকুর রহমান তৌফিক পাঁচবার এবং সামিউল ইসলাম রাতুল ছয়বার রক্ত দিয়েছেন।
তাদের মতে, রক্তদানের ভয় ও দ্বিধা দূর করতে পারলে আরও অনেকে এ কাজে এগিয়ে আসবেন। রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও রক্তদান সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতেও কাজ করে ড্রিম। কুয়েটের পাশাপাশি খুলনা ও যশোরের প্রত্যন্ত এলাকার স্কুলগুলোতে ক্যাম্পেইন করে শিক্ষার্থীদের রক্তের গ্রুপ নির্ণয় এবং রক্তদানের গুরুত্ব সম্পর্কে জানানো হয়। তবে কাজের পথে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কুয়েট থেকে খুলনা শহরের দূরত্বের কারণে ডোনারদের ক্লাস, ল্যাব কিংবা টিউশনের সময় ব্যয় হয়। ফলে জরুরি সময়ে ডোনার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া কুয়েট মেডিকেল সেন্টারে দক্ষ জনবলের ঘাটতি থাকায় কখনও কখনও রক্তদানের সময় সমস্যায় পড়তে হয় বলে অভিযোগ করেন জাহিদ। তারপরও জরুরি ফোন এলে ডোনার খোঁজার চেষ্টা থেমে থাকে না। কখনও রক্তের ব্যবস্থা হয়, কখনও হয় না। কখনও আসে কৃতজ্ঞতার ফোন, কখনও শুনতে হয় প্রিয়জনকে হারানোর খবর। কোনো আর্থিক প্রাপ্তির প্রত্যাশা নয়, মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর তাগিদই ড্রিমের স্বেচ্ছাসেবীদের এগিয়ে নেয়। রাত গভীর হলেও তাই তাদের ছুটে চলা যেন থামে না– একজন ডোনার খোঁজার, একটি জীবন বাঁচানোর আশায়।
- বিষয় :
- কুয়েট