বিশ্ব বসতি দিবস আজ
রাজধানীতে ২ কোটি মানুষ ভাড়া বাসায় থাকে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:০৭ | আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:০৮
রাজধানীর পূর্ব কাজীপাড়ার মাদবর পুকুরপাড়ে ভাড়া বাসায় থাকেন একটি নামি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জাকির হোসেন। ২৬ বছর ধরে চাকরি করছেন তিনি। কর্মস্থলের নিয়ম অনুযায়ী, আর চার বছর পর অবসরে যেতে হবে। অথচ দীর্ঘ কর্মজীবনেও ঢাকায় বাড়ি করার জন্য জমি কেনা কিংবা একটি ফ্ল্যাট কেনার সামর্থ্য হয়নি তাঁর।
হতাশা প্রকাশ করে জাকির হোসেন বলেন, একসময় রাজধানীতে নিজের একটি ফ্ল্যাট কিংবা শহরতলিতে স্বপ্নের ঠিকানা গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। এখন আর সেই স্বপ্ন দেখেন না। তিনি বলেন, ‘যা বেতন পাই, তা দিয়ে সংসার মোটামুটি চলে। অতিরিক্ত কিছু করার মতো টাকা হাতে থাকে না। ছেলেমেয়ের লেখাপড়া, অসুস্থ মায়ের ওষুধপত্র ও পরিবারের পেছনেই সব ব্যয় হয়ে যায়।’
জাকির হোসেনের মতো এমন বাস্তবতার মুখোমুখি ঢাকায় বসবাসকারী বহু মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত কর্মজীবী মানুষ। নিম্ন আয়ের মানুষের অবস্থা আরও করুণ। তাদের একটি অংশের ঠাঁই হয় বস্তি কিংবা বসবাসের অনুপযোগী ছোট কক্ষে।
রাজধানীতে কত মানুষ নিজের বাড়িতে থাকেন, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, ঢাকার জনসংখ্যা আড়াই কোটি হলে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ মানুষের নিজস্ব আবাসন রয়েছে। সে হিসাবে বাকি দুই কোটি মানুষকে ভাড়া বাসায় থাকতে হয়।
এমন বাস্তবতায় আজ সোমবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব বসতি দিবস। ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৮৬ সাল থেকে প্রতিবছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’। দিবসটি উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর একটি কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান থাকবেন। গতকাল রোববার গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে শেরেবাংলা নগর এলাকায় র্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আজ থেকে শুরু হচ্ছে তিন দিনের আবাসন মেলা।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজাল সমকালকে বলেন, আবাসন সংকট সমাধানে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রথমত, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের জন্য বিশেষ আবাসন অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন, যাতে দীর্ঘ মেয়াদে কম সুদে ঋণ পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে।
ড. আলী আফজাল বলেন, আবাসন খাতের ওপর কর ও ফি যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। সরকার চাইলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে রাজধানীসহ দেশের সব জেলা শহরে সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প হাতে নিতে পারে। তিনি বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নীতিতে স্থিতিশীলতা থাকতে হবে। উদ্যোক্তারা যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের নিশ্চয়তা পান, তাহলে তারা আরও বেশি আবাসন তৈরি করতে পারবেন। এতে অনেকেরই নিজস্ব বাসস্থান হবে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট, রিহ্যাবসহ আবাসন খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙনসহ বিভিন্ন কারণে রাজধানীতে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তবে সবার মাথা গোঁজার ঠাঁই রাজধানীতে হচ্ছে না। তারা বস্তি, ফুটপাত, বাস-লঞ্চ-ট্রেনস্টেশনেও রাত কাটাচ্ছেন।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, রাজধানীতে কিছু মানুষ ভাড়া বাসায় থাকবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ঢাকায় নিজস্ব আবাসন ও ভাড়া বাসায় বসবাসের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা অত্যন্ত প্রকট। এখানে ৭০ শতাংশের বেশি মানুষের নিজস্ব বাসস্থান নেই। তাদের মধ্যে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের পাশাপাশি রয়েছেন বস্তিবাসীও।
ড. আদিল বলেন, এসব মানুষের পক্ষে নিজস্ব আবাসনের ব্যবস্থা করা কঠিন। তাদের আয়ের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই আবাসন খাতে ব্যয় হয়। ফলে যুগের পর যুগ তারা নিজস্ব আবাসনের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ সরকারের যথাযথ আবাসন নীতির ঘাটতি।
এই ভারসাম্যহীনতা দূর করতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য জমি বরাদ্দ এবং স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন ড. আদিল। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।
সবার জন্য বাসস্থান নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীল কেউ কথা বলতে রাজি হননি। তবে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের একটি তালিকা সরবরাহ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে উচ্চ, মধ্যম ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ভূমি উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং আবাসিক প্লট তৈরি করে বরাদ্দ দেওয়ার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণের পাশাপাশি স্বল্প খরচে টেকসই ঘর তৈরির কলাকৌশল ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং তা বিপণনের উদ্যোগও রয়েছে। গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ৩ হাজার ৫১৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪৪টি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এর মধ্যে রয়েছে মিরপুরের ৯ নম্বর সেকশনে ১৫টি ১৪ তলা আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্প।
- বিষয় :
- রাজধানী