ঢাবিতে আলী রীয়াজ
স্বৈরাচারকে পরাস্ত করা গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রথম ধাপ
ছবি: সমকাল
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ২২:৫৮
স্বৈরাচারকে পরাস্ত করা গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রথম ধাপ বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, তবে গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রকৃত গণতান্ত্রিক অংশীদারিত্ব তৈরি সম্ভব।
বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের আয়োজনে ‘আলী রীয়াজ স্নাতকোত্তর গবেষণা পুরস্কার ও বৃত্তি’ প্রদান অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।
স্নাতকোত্তর গবেষণা প্রস্তাব ও সেরা স্নাতকোত্তর গবেষণা–এই দুই ক্যাটেগরিতে বিভাগের সাতজন শিক্ষার্থী এই পুরস্কার ও বৃত্তি পেয়েছেন। সেরা স্নাতকোত্তর গবেষণা পুরস্কার পেয়েছেন অর্থী নবনীতা ও ফারাহ জাহান শুচি। আর স্নাতকোত্তর গবেষণা প্রস্তাব বৃত্তি পেয়েছেন ফারাহ জাহান শুচি, উসামা রাফিদ, আজরা হুমায়রা, কৌরিত্র পোদ্দার তীর্থ, মোহাম্মদ আল মুকিত ও মুহাম্মদ মুযযাম্মিল হক। তাদের মধ্যে ফারাহ জাহান শুচি দুই ক্যাটেগরিতেই পুরস্কার পেয়েছেন।
আমলাতন্ত্রের ভূমিকা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আলী রীয়াজ বলেন, গত ১৫ থেকে ১৬ মাসের মধ্যে প্রায় ৯ মাস তিনি প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করেছেন। এত বড় গণঅভ্যুত্থান এবং পুরোনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের প্রত্যাখ্যানের পরও আমলাতন্ত্রের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের ইচ্ছা দেখেননি তিনি।
সংস্কার ঠেকাতে নানা ধরনের বাধা সৃষ্টির অভিযোগ তুলে আলী রীয়াজ বলেন, বাস্তবতাকে আড়াল না করে স্পষ্টভাবে বলতে হবে– আমলাতন্ত্র সংস্কারবিরোধী। তার মতে, আমলাদের একটি অংশ প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে নয়, রাজনৈতিক কর্মীর মতো রাজনৈতিক প্রভুদের সেবা করতে বেশি আগ্রহী।
বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের কারণ নিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, সংকটের মূল কারণ ১৯৪৭ বা ১৯৭১ সালের ইতিহাস নয় বরং ১৯৯১ সালের পর থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রের রাজনীতিকীকরণ। পরবর্তী সরকারগুলোর সময়ে এই প্রবণতা অব্যাহত ছিল এবং ২০০৯ সালের পর রাষ্ট্রযন্ত্র সরাসরি একটি দলের যন্ত্রে পরিণত হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর প্রভাব রয়েছে। এই কাঠামোর পরিবর্তন না হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা কঠিন।
বিচার বিভাগসহ গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। রাষ্ট্রের স্বার্থে এই ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন বলেও জানিয়েছেন আলী রীয়াজ।
তবে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক এই চক্র ভেঙে বাংলাদেশ বেরিয়ে আসতে পারবে কিনা– এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো ঠিক হবে না জানিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, বাংলাদেশে পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর জন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলো প্রকৃত অর্থে সংস্কারের পথে যেতে কতটা ইচ্ছুক, সেটিই বড় প্রশ্ন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে আলী রীয়াজ বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে হয়নি। বরং এটি ছিল প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের প্রত্যাখ্যানের বহিঃপ্রকাশ। পরে রাজনৈতিক দলগুলো সেই জায়গা আবার দখল করলেও ওই সময় জনগণের দেওয়া বার্তাটি বোঝা জরুরি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান।