ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

রাড্ডায় হামলা-লুটপাট

মধ্যরাতে ভূরিভোজের আয়োজন করেন সাবেক যুবদল নেতা

মধ্যরাতে ভূরিভোজের আয়োজন করেন সাবেক যুবদল নেতা
×
×

 সাহাদাত হোসেন পরশ

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫৭ | আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর মিরপুরে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িত আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি হলেন শাহ আলী থানা অটোরিকশা শ্রমিক দলের বহিষ্কৃত সদস্য হুজাইফা। গত রোববার রাতে শাহ আলী এলাকায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও শাহ আলী থানা পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। 

এ নিয়ে আলোচিত এই ঘটনায় গত ১৯ দিনে ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে একজন আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। গতকাল তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

রাড্ডাকাণ্ডে কার কী ভূমিকা ছিল, তা পুলিশের তদন্তে উঠে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাকারী, হামলাকারী ও অর্থদাতাদের শনাক্ত করা হচ্ছে। ঘটনার রাতে যারা হামলা-লুটপাটে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের জন্য খিচুড়ি ও গরুর মাংস খাওয়ার আয়োজন করা হয়। এই আয়োজনের দায়িত্বে ছিলেন শাহ আলী থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক রাকিব আহমেদ সোহেল। তিনি ভূরিভোজের কেনাকাটা করেন। সোহেলকে এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আগামী রোববার সোহেলকে হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। 

গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশি অস্ত্র ও ভাঙচুরের সরঞ্জাম নিয়ে রাড্ডায় প্রবেশ করে নিরাপত্তাকর্মীদের মারধর করেন। তাদের মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে জিম্মি করা হয়। এর পর চিকিৎসা সরঞ্জাম, টিকা, এসি, ফ্রিজ, নগদ টাকা ও অন্যান্য মালপত্র লুট করা হয়। সেই রাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে সেখানে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে।

১৯৭৪ সাল থেকে মিরপুর ১ নম্বরে ১০ কাঠা ওই জায়গার ওপর শিশু ও মাতৃসেবা দিয়ে আসছে রাড্ডা। সেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার সঙ্গে শুরু থেকে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের স্থানীয় অনেক নেতাকর্মীর সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ ওঠে। হামলায় জড়িতদের একটি অংশ বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের (মিষ্টি) অনুসারী হিসেবে পরিচিত। নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ফেরদৌসী আহমেদ পদত্যাগ করেন। এরই মধ্যে তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। 

রাড্ডার ঘটনার পর জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ফেরদৌসী আহমেদের পদত্যাগ ছাড়াও বিএনপি, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিক দলের ১৪ জনকে বহিষ্কার করা হয়। তবে দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে রাড্ডায় হামলার কথা উল্লেখ করা হয়নি। সংগঠন থেকে বহিষ্কার করার কারণ হিসেবে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাড্ডার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। 

গতকাল তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদ, স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাড্ডায় হামলার ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির তিনটি গ্রুপের সদস্যরা জড়িত ছিলেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরস্পরবিরোধী এসব গ্রুপের মধ্যে বিভাজন থাকলেও রাড্ডার বিষয়ে তারা একে অপরকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। রাড্ডার ঘটনার কিছুদিন আগে একই এলাকায় আরেকটি সমবায় সমিতির ২৪ কাঠা জায়গা কৌশলে ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাড্ডার ঘটনায় জড়িতদের মধ্যে অনেকে ওই ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিলেন। 

যে ২৪ জন গ্রেপ্তার

তদন্ত সূত্র বলছে, এখন পর্যন্ত যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাদের মধ্যে সমমনা সমবায় সমিতির সংশ্লিষ্ট সাতজন। তারা হলেন– সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম, সহসভাপতি কাজী মকবুল হোসেন, সদস্য আতিকুর রহমান, কামরুল ইসলাম, সাবেক সভাপতি আবদুর রহিম হাজরা ও অফিস সহকারী শাহাদত হোসেন। এ ছাড়া বাকি গ্রেপ্তারদের মধ্যে আছেন শাহ আলী থানা বিএনপির সদস্য সাইফুল ইসলাম খোকন, শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক দলের সভাপতি মো. আলম, শাহ আলী থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আলম, ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের বহিষ্কৃত সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, কথিত জাতীয়তাবাদী সাইবার দলের সহসভাপতি সাজ্জাদ হোসেন শাকিল, সোহেল, জুয়েল, জিহাদ হাসান, রাব্বী, মিন্টু, রতন ও তরিকুল ইসলাম। 

অর্থদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করতে তাদের হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে শুনানির দিন ধার্য আছে। তবে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাকিব আহমেদ সোহেল বলেছেন, হামলাকারীদের জন্য গরুর মাংস ও খিচুড়ির আয়োজন করেন তিনি। ঘটনার রাতে সিসি ক্যামেরায় সোহেলকে দেখা গেছে। তবে সোহেল রাড্ডার ঘটনায় সুবিধাভোগী হিসেবে, নাকি অন্য কারও নির্দেশে মধ্যরাতে হামলাকারীদের জন্য খাবার আয়োজন করেছেন– এটি আরও গভীরভাবে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। 

তদন্ত সূত্র বলছে, রাড্ডার ঘটনায় আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তারা সরাসরি ও নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছেন বলে অভিযোগ। তাদের মধ্যে আছেন মামলার একমাত্র এজাহারভুক্ত আসামি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য হানিফ মিয়া, শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ লেলিন, ঢাকা মহানগর যুবদলের সাবেক সদস্য সচিব মোস্তফা জগলুল পাশা পাপেল, দারুস সালাম থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব হাফিজুর রহমান, শাহ আলী থানা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন ও ৯৩নং ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ইলিয়াস। মোবাইল ফোন নম্বর বন্ধ রেখে তারা এরই মধ্যে গা-ঢাকা দিয়েছেন।
 
তদন্তে তিন বিষয় অগ্রাধিকার 

গোয়েন্দা পুলিশের তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তিনটি ধাপে আলোচিত এ ঘটনার তদন্ত করা হচ্ছে। প্রথমত, পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করা। দ্বিতীয়ত, যারা হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের শনাক্ত করা। তৃতীয়ত, গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করা। বিভিন্ন ধাপে যারা হামলায় ভূমিকা রেখেছেন, তাদের চিহ্নিত করতে সাতজনকে হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, তাদের কাছে তদন্ত আরও এগিয়ে নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। এ ছয়জন হলেন– রাকিব আহমেদ সোহেল, আবদুর রহিম হাজরা, সরওয়ার আলম পিয়াস, হুজাইফা, রতন ও মিলন। ১৯ অক্টোবর তাদের হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদের দিন ধার্য রয়েছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাড্ডার ঘটনার কিছুদিন আগে শাহ আলী এলাকায় ঈদগাহ মসজিদের পাশে স্থানীয় প্রভাবশালীদের একটি বৈঠক হয়েছিল। সেই বৈঠকে কারা ছিলেন, তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। সেখানে যারা উপস্থিত ছিলেন, তাদের অনেকের সঙ্গে রাড্ডার ঘটনারও যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া শাহ আলী এলাকা থেকে ভাসমান অনেক শ্রমিককে রাড্ডায় হামলা করতে ভাড়া করা হয়। যারা ভাড়া করেছেন, তাদের শনাক্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাড্ডার হামলা ও মালপত্র সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ভেকু, কাভার্ড ভ্যান ও এক্সক্যাভেটর বহনকারী গাড়ি লোবেডসহ যেসব সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছিল, তা জব্দ করেছে পুলিশ।

রাড্ডায় লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনার পর স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়াসহ অজ্ঞাতপরিচয় ২০০-২৫০ জনকে আসামি করে শাহ আলী থানায় মামলা করেন রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।  

কেন্দ্রটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার সমকালকে বলেন, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক তাঁর ব্যক্তিগত ফান্ড থেকে অর্থ দিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি সংস্কার করে দিয়েছেন। ১০ অক্টোবর এটি আমাদের কাছে এটি হস্তান্তর করা হয়েছে। সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার পর আমরা চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছি। তবে সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা চালু করতে বেশ কিছু সরঞ্জামের প্রয়োজন।  

আরও পড়ুন

×